প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জোনাথন টাহর হেডে গোলটি বৈধ হলে জার্মানি হয়তো বিশ্বকাপে টিকে যেত। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনার পর সেই গোল বাতিল হয়। এরপর টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এবার সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছে ফিফা।
জার্মানি-প্যারাগুয়ে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে কর্নার থেকে হেডে বল জালে পাঠান টাহ। প্রথমে গোল উদ্যাপন শুরু করেছিল জার্মানি। কিন্তু ভিএআর রিভিউয়ের পর রেফারি গোল বাতিল করেন। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, জার্মান ডিফেন্ডার ওয়ালদেমার আন্তন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের চলাচলে বাধা দিয়েছেন।
রিপ্লেতে দেখা যায়, কর্নারের সময় আন্তন গিলের সামনে অবস্থান নেন এবং তার পথ আটকে দেন। সংস্পর্শ খুব জোরালো ছিল না বলে সিদ্ধান্তটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকের মতে, এমন সামান্য শরীরী বাধায় গোল বাতিল করা কঠোর সিদ্ধান্ত। তবে ফিফা বলছে, বিষয়টি শুধু ধাক্কার মাত্রা নয়, খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্য ও গোলরক্ষককে আটকানোর কৌশলের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা ব্যাখ্যা করেছেন, শুধু জায়গা ধরে রাখা নিজে নিজে ফাউল নয়। তবে আক্রমণভাগের কোনো খেলোয়াড় যদি বল খেলার চেষ্টা না করে ইচ্ছাকৃতভাবে সামান্য হলেও সরে গিয়ে প্রতিপক্ষের চলাচল বাধাগ্রস্ত করেন এবং তাকে রক্ষণ করতে না দেন, তাহলে রেফারি ও প্রয়োজনে ভিএআরকে ঘটনাটি খতিয়ে দেখে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
কলিনার মতে, গোলরক্ষককে গোল রক্ষা করা থেকে আটকানোর উদ্দেশ্যে এমন কৌশল নেওয়া হলে সেটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, কোচ ও খেলোয়াড়দের আগে থেকেই এ বিষয়ে জানানো হয়েছিল। তাই রেফারিরা এমন ফাউল শাস্তি দিলে সেটি বিস্ময়কর হওয়ার কথা নয়।
এই ব্যাখ্যার পরও বিতর্ক থামছে না। জার্মান শিবির ও অনেক সাবেক ফুটবলার মনে করছেন, সিদ্ধান্তটি অতিরিক্ত কঠোর ছিল। কারণ আন্তনের সংস্পর্শ খুব জোরালো ছিল না এবং গিলের বলের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটা বাস্তব ছিল, সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। ইংল্যান্ডের সাবেক ফরোয়ার্ড অ্যালান শিয়ারারও সিদ্ধান্তটিকে খুব নরম ফাউল হিসেবে দেখেছেন।
তবে ফিফার অবস্থান পরিষ্কার। বিশ্বকাপে সেট-পিসের সময় গোলরক্ষককে আটকে রাখার প্রবণতা ঠেকাতেই এই কড়াকড়ি। কর্নার বা ফ্রি-কিকে আক্রমণকারী খেলোয়াড়রা যদি বলের দিকে না গিয়ে গোলরক্ষক বা রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের পথ আটকে দেন, সেটি এখন বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
জার্মানির জন্য সিদ্ধান্তটি ছিল ভয়ংকর ধাক্কা। টাহর গোল বৈধ হলে তারা অতিরিক্ত সময়ে এগিয়ে যেত। কিন্তু গোল বাতিলের পর ম্যাচ ১-১ সমতায় থাকে। পরে টাইব্রেকারে প্যারাগুয়ে ৪-৩ ব্যবধানে জেতে। জার্মানির হয়ে কাই হাভার্টজ ও নিক ভলটেমাডের পেনাল্টি ঠেকান গিল। পরে টাহর শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত হোসে কানালের পেনাল্টিতে নিশ্চিত হয় প্যারাগুয়ের জয়।
এই ঘটনায় ভিএআর নিয়ে পুরোনো বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। এক পক্ষ বলছে, নিয়মের প্রয়োগ ঠিক হয়েছে। অন্য পক্ষের দাবি, ফুটবলের স্বাভাবিক শারীরিক লড়াইকে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করে বড় ম্যাচের ফল বদলে দেওয়া হয়েছে। নকআউট পর্বের মতো চাপের ম্যাচে এমন সিদ্ধান্ত তাই আরও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফিফা অবশ্য শুধু এই ঘটনাই নয়, বিশ্বকাপের নতুন নিয়মগুলো নিয়েও সন্তুষ্ট। সময় নষ্ট রোধে গোলকিক, থ্রো-ইন ও বদলির সময়সীমা, চিকিৎসার পর খেলোয়াড়কে এক মিনিট বাইরে থাকার নিয়ম, এসব ব্যবস্থা ইতিবাচক ফল দিচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।
তবে জার্মানির কাছে এই ব্যাখ্যা হয়তো খুব বেশি সান্ত্বনা দেবে না। তাদের দৃষ্টিতে একটি গোল বাতিল, এরপর টাইব্রেকারে হার এবং বিশ্বকাপ থেকে বিদায়, সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
এসএ