ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই নারকীয় ক্ষত কাটিয়ে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে উগ্রবাদ দমনে অভূতপূর্ব সাফল্য এলেও, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাইবার প্রচারণা ও নতুন ধরনের উগ্রবাদের কারণে কাটেনি নিরাপত্তা ঝুঁকি।
বিগত বছরগুলোতে ১ জুলাই সকালে গুলশানের সেই ভবনটিতে (সাবেক হলি আর্টিজান) নিহতদের স্মরণে তৈরি বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতেন জাপান ও ইতালি দূতাবাসের কর্মকর্তারা। তবে এক দশক পূর্তির এই দিনে ঘটনাস্থলে প্রথাগত কোনো কর্মসূচি থাকছে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এম তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, এবার দূতাবাসগুলো সমন্বয় করে ইতালি দূতাবাসে একটি বিশেষ স্মরণসভার আয়োজন করেছে।
তিনি বলেন, দূতাবাসগুলো সমন্বয় করে ইতালি দূতাবাসে এ দিনটি স্মরণ করবে। তবে ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো কর্মসূচি নেই। ১০ বছর আগের ওই হামলায় ২২ জন দেশি-বিদেশি নাগরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয় ও ৭ জন জাপানি নাগরিক ছিলেন।
এই হামলার পরই মূলত বাংলাদেশে ডিএমপির অধীনে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং পুলিশের বিশেষায়িত অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর মতো ডেডিকেটেড কাউন্টার-টেরোরিজম উইং গঠিত হয়, যা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনে।
হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৭ জঙ্গিকে ফাঁসির আদেশ দেন। তবে পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ে হাইকোর্ট তাদের সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।
আদালতের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এই সাত জঙ্গি হলেন-জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন। এছাড়া হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশই ঘটনার পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রকাশ্য উত্থান শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে। আফগান যুদ্ধফেরত কিছু ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার এবং দেশীয় কয়েকটি চরমপন্থী সংগঠনের সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে বিষয়টি ধীরে ধীরে নিরাপত্তা উদ্বেগে পরিণত হয়। তবে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় প্রায় একযোগে শতাধিক স্থানে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্বকে প্রথমবারের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
এর আগে ও পরে জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি)-এর মতো সংগঠন বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) এবং নব্য জেএমবিসহ আরও কয়েকটি গোষ্ঠীর নাম আলোচনায় আসে।
এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান হামলা ছিল দেশের ইতিহাসে জঙ্গিবাদের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন ঘটনা। ওই হামলার পর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সন্ত্রাসবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে ব্যাপক ক্র্যাকডাউন শুরু হয়। গোয়েন্দা তৎপরতা, সাইবার নজরদারি ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় জোরদার করার মাধ্যমে পরবর্তী বছরগুলোতে নব্য জেএমবিসহ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী জঙ্গি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দিতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আরবি লেখা সাদা পতাকা টানানোর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের নজরে এসেছে। বিশেষ করে সড়ক সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও জনসমাগমস্থলে এসব পতাকা দেখা যাওয়ার পর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাদের পর্যবেক্ষণ বাড়িয়েছে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, কয়েকটি এলাকায় মোটরসাইকেলে এসে রাতের অন্ধকারে বা ভোরের আলো ফোটার আগে পতাকা টানানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত চলছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকে জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে গুজব প্রতিরোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়কে ব্যবহার করে সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে। তাই ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি, তবে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে এখনই দায়ী করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর-এর প্রকাশ্য কার্যক্রম নতুন করে আলোচনায় আসে। সরকার পরিবর্তনের পর ৭ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য এলাকায় সংগঠনটির সমর্থকদের সমাবেশ ও লিফলেট বিতরণ করতে দেখা যায়। পরবর্তীতে সংগঠনটি নিজেদের ওপর ২০০৯ সালে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে এবং সংবাদ সম্মেলন করে।
হিযবুত তাহরীরের এই তৎপরতার প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদর দপ্তর ২০২৫ সালের মার্চে এক নির্দেশনায় পুনর্ব্যক্ত করে যে, সংগঠনটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ অনুযায়ী এর যেকোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সভা-সমাবেশ, মিছিল বা প্রচারণাসহ সব ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) ও র্যাব জানিয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতাদর্শিক প্রচারণা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা এখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অন্যতম উদ্বেগের বিষয়।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই প্রাথমিক স্তরের ছিল। তবুও যেকোনো ধরনের সাংগঠনিক পুনরুত্থানের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, উগ্রবাদ নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। কোনো সংগঠন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে গেলেও তার মতাদর্শ পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না।
প্রথাগত কাঠামোর বদলে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে ‘লোন উলফ’ বা বিচ্ছিন্ন চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, পরিবার, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার করা জরুরি।
বাংলাদেশ গত এক দশকে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এই অর্জন ধরে রাখতে হলে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও আধুনিক, তথ্যনির্ভর এবং প্রতিরোধমুখী করে গড়ে তোলাই হবে আগামী দিনের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
-টিএস