ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
বুয়েট ও রাজউকের গবেষণা
ঢাকার অর্ধেকের বেশি এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১১:১১ এএম আপডেট: ০১.০৭.২০২৬ ১১:১৭ এএম
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল শক্তিশালী ভূমিকম্পে মাটির তরলীকরণ বা লিকউইফ্যাকশন  হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজউক ও বুয়েটের সাম্প্রতিক এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, রাজউকের আওতাধীন ১,৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ অঞ্চলের মাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা বড় ধরনের ভূমিকম্পে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) কঠোরভাবে অনুসরণ এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাটির গুণগত মানোন্নয়ন করা গেলে এই ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক আকারে কমানো সম্ভব।

সম্প্রতি ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নগরীর ভূপ্রকৃতি ও নির্মাণ ত্রুটি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদ ও প্রকৌশলীদের মতে, ঢাকার দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ, জলাভূমি ভরাট এবং নিচু এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আলগা বা কৃত্রিমভাবে ভরাট করা মাটির কারণে ভূমিকম্পের সময় কম্পনের মাত্রা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়, যা ভবনধসের অন্যতম কারণ হতে পারে।

প্রকৌশলগত সমাধান ও মাটির উন্নয়ন

ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি তরলীকরণ-প্রবণ ও দুর্বল হওয়ায় উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবন নির্মাণের আগে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে সঠিক পাইলিং এবং মাটির উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, ঢাকার নতুন সম্প্রসারণের একটি বড় অংশ বালু ভরাট বা পুনরুদ্ধার করা জমির ওপর গড়ে উঠেছে, যা কম্পন বৃদ্ধি ও তরলীকরণের সমস্যা তৈরি করে। তবে এসব এলাকায় নিরাপদ নির্মাণ সম্পূর্ণ সম্ভব। 

তিনি বলেন, সাধারণভাবে যেখানে ভরাটের গভীরতা ৪০–৪৫ মিটার, সেখানে ওপরের মাত্র ৫–৬ মিটার মাটি উন্নত করলেই ভূমিকম্পের কম্পনের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ‌‍‌‍‍সিমেন্ট ইনজেকশন প্রযুক্তির উদাহরণ দিয়ে জানান, এই পদ্ধতি বালুমাটি অনেক বেশি শক্তিশালী করতে পারে। তবে ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক নির্মাতা মাটি শক্ত করার বিষয়টি এড়িয়ে যান। বর্তমানে ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভরাট জমিতে শুধু পাইল ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু আশপাশের মাটি শক্ত করা হয়নি, যা ঝুঁকি বাড়ায়। মাটির উপযুক্ত উন্নয়ন না হলে ২০০১ সালের ভারতের কাণ্ডলা বন্দরের মতো ঘটনা ঘটতে পারে, যেখানে ৬০ ফুট গভীর পাইল থাকা সত্ত্বেও পানিসিক্ত মাটির কারণে একটি ভবন ১৫ ডিগ্রি হেলে গিয়েছিল। 

অন্যদিকে, নরম কাদামাটির কম্পন বৃদ্ধির উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৮৫ সালের মেক্সিকো সিটি ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ৩০০ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তিস্থল হওয়া সত্ত্বেও নরম মাটির কারণে বহু মাঝারি উচ্চতার ভবন ধসে পড়েছিল।

মাটির বৈশিষ্ট্য ও নকশা প্রণয়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান জানান, যেকোনো মাটিতেই সঠিক নিয়ম মেনে নিরাপদ ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। তার মতে, ঢাকার মাত্র ৩৫ শতাংশ এলাকা শক্ত লাল প্লাইস্টোসিন মাটির ওপর অবস্থিত। অবশিষ্ট অংশ জলাভূমি, বন্যাপ্রবণ সমভূমি, পরিত্যক্ত নদীখাত ও নিছু অববাহিকা নিয়ে গঠিত।

তিনি জানান, পুরান ঢাকা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, খিলগাঁও, মতিঝিল, তুলনামূলক শক্ত মাটির ওপর অবস্থিত। অন্যদিকে বাসাবো, বাড্ডা, উত্তরখান ও দক্ষিণখানের কিছু এলাকায় লাল মাটি ভূপৃষ্ঠের ১০–২০ ফুট নিচে, ফলে সেগুলোকে মাঝারি মানের ভূমি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী বন্যাপ্রবণ এলাকায় লাল মাটি ৮০–১৫০ ফুট নিচে অবস্থান করে। এর ওপর রয়েছে নরম কাদামাটি ও নতুন ভরাট স্তর, যা নির্মাণকে আরও কঠিন করে তোলে।

অধ্যাপক জিল্লুর রহমান বলেন, পুরোনো জলাভূমিতে কম্পন কখনও কখনও দ্বিগুণ হতে পারে। তাই ভবনের উচ্চতা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন ভূমিকম্পের সময় অনুরণন বা ভূমিকম্প পরবর্তী পুনঃ দোলা সৃষ্টি না হয়।

তিনি বলেন, নকশা অবশ্যই মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হতে হবে। নির্দেশিকা ঠিকভাবে মানলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

বুয়েটের লিকউইফেকশন পটেনশিয়াল ইনডেক্স (এলপিআই) বুয়েট লিকউইফেকশন পটেনশিয়াল ইনডেক্স (এলপিআই) অনুযায়ী ঢাকার মাটিকে চারটি রঙে ভাগ করেছে। এর মধ্যে ১৫-এর বেশি এলপিআই মান সম্পন্ন লাল অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

অধ্যাপক আনসারী বলেন, মাত্রা ৭.৫-এর ভূমিকম্প হলে লাল অঞ্চলে মারাত্মক ভূমিধস বা মাটির ব্যর্থতা (গ্রাউন্ড ফেইলার) দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উঁচু—যেমন পুকুর, খাল ও নদীর আশপাশে।

এছাড়া ১০ থেকে ১৫ এলপিআই মান বিশিষ্ট ম্যাজেন্টা অঞ্চলকে মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি এবং ৫ থেকে ১০ এলপিআই মানের নীল অঞ্চলকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলা হয়েছে। আর ৫-এর নিচে এলপিআই মান থাকা সবুজ অঞ্চলকে সর্বনিম্ন ঝুঁকির আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

নীতি নির্ধারণ ও আবাসন খাতের প্রস্তুতি

ঝুঁকি কমাতে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ আরবান রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রামের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালী জানান, নরম মাটির ঝুঁকির একটি মানচিত্র তৈরি করা হলেও রাজউক এখনো তা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেনি।

তবে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ড্যাপ-২০২২ গেজেট হওয়ার পর তারা এই মানচিত্র ও পরিকল্পনা পেয়েছেন। এটি বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে এবং ড্যাপ হালনাগাদ করার সময় তারা এটি অন্তর্ভুক্ত করবেন।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া জানান, সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে সচেতন এবং তারা বিএনবিসি অনুসরণ করেন। তাদের ব্যবহৃত স্টিল ও সিমেন্ট ভূমিকম্প সহনশীলতার বিষয়টি মাথায় রেখেই উৎপাদিত। সাম্প্রতিক ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর রিহ্যাব একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ খুলেছিল এবং সেখান থেকে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। 

তবে তিনি স্বীকার করেন, ৭ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রভাব আগে থেকে নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন।

চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমূহ

লাল অঞ্চল (সর্বোচ্চ ঝুঁকি)
হজরতপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, তেঘরিয়া, কোন্ডা, এনায়েতনগর, কাশীপুর, কালাগাছিয়া, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, বন্দর, মোগরাপাড়া, নারায়ণগঞ্জ সদর, বক্তাবলী, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কিছু অংশ, নিউমার্কেট, লালবাগ, মদনপুর, দুমনি, বাড্ডা, পাঠালিয়ার কিছু অংশ, আশুলিয়া, কাটাবল্লী এবং দারুস সালাম।

ম্যাজেন্টা অঞ্চল (মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি)
কোনাবাড়ী, ইয়ারপুর, হরিরামপুরের কিছু অংশ, বিরালিয়া, বিভিন্ন পৌরসভা এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট, পল্লবী, গুলশান, রূপগঞ্জ, ভুলতা, খিলগাঁও, কাফরুল ও দক্ষিণখানের কিছু অংশ, আদাবর, তেজগাঁও, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা,সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, কদম রসুল পৌরসভা, মুসাপুর, ফতুল্লা ও হাজারীবাগের কিছু অংশ, সাদিপুর, কাঞ্চপুর এবং পল্টন।


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝