দেশবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম এই বাজেটটি পেশ করবেন নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি পাশ হলে তা হবে দেশের ৫৫তম এবং বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে যাচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যেখানে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি থাকতে পারে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে বেঁধে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
এবারের বাজেটে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে যেমন বড় ধরণের শুল্কছাড় দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তেমনি বিলাসী পণ্য ও তামাকের ওপর বসছে অতিরিক্ত কর। একনজরে দেখে নিন কোন কোন পণ্যের দাম কমছে এবং কোনগুলোর বাড়ছে:
বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
বাজারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণে ২০৩০ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০ সাল পর্যন্ত কর ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্যাট ও আমদানিতে ব্যাপক শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব আসছে। এর ফলে যেসব খাতে দাম কমবে:
১. নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও কৃষিখাত
৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্য: সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ ৬০টি পণ্যের ওপর আমদানির উৎসে কর ১ থেকে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এসব পণ্য থেকে রেগুলেটরি ডিউটি বা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার হতে পারে।
ভোজ্যতেল উৎপাদন: আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় তৈল বীজ (যেমন: সরিষা) ব্যবহার করে তেল উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের জন্য আগামী ১০ বছরের জন্য শূন্য শতাংশ কর হারের প্রস্তাব আসতে পারে, যা স্থানীয় তেলের দাম কমাবে।
সার ও কীটনাশক: কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হতে পারে।
শিল্পের কাঁচামাল: শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ৪% করা হচ্ছে এবং রেগুলেটরি শুল্কের স্তর ৯টি থেকে কমিয়ে ৬টিতে আনা হতে পারে।
কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার: আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করা হতে পারে। এর ফলে কিডনি রোগীদের প্রতিটি ডায়ালাইসিসে খরচ প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে।
ওষুধের কাঁচামাল: ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত ৬৮টি কাঁচামাল আমদানির সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির ৯টি কাঁচামালে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
হার্টের রিং ও চোখের লেন্স: হৃদরোগী ও চোখের রোগীদের স্বস্তিতে হার্টের রিং এবং চোখের লেন্সের ওপর থাকা ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হতে পারে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পণ্য: শারীরিক প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।
৩. মোবাইল ফোন, সিম ও টেলিযোগাযোগখাত
মোবাইল উৎপাদন ও কাঁচামাল: স্থানীয়ভাবে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২টি কাঁচামালের উৎসে কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে এবং এ খাতে মূসক বা ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হতে পারে।
মোবাইল সিম কার্ড: মোবাইল সিমের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকার ট্যাক্স বা কর বাতিল করা হতে পারে; ফলে সরাসরি মোবাইল সিমের দাম কমবে।
নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্স ফি: মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া বিটিআরসির লাইসেন্স ফি ও রেভিনিউ শেয়ারের ওপর থাকা ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার হতে পারে।
৪. বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ ও গ্রিন এনার্জি
বিদ্যুৎ ক্রয়: বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার উৎসে কর ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হতে পারে এবং গ্রাহকদের বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা বহাল থাকবে।
সৌরবিদ্যুৎ ও যন্ত্রপাতি: সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এবং সৌর বিদ্যুতের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতির সুবর্ণ সুযোগ আসতে পারে।
৫. ইলেকট্রিক যানবাহন বা পরিবেশবান্ধব গাড়ি
ই-বাস ও ই-ট্রাক: পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন, ইলেকট্রিক বাস ও ইলেকট্রিক ট্রাক আমদানির উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব আসছে।
গাড়ির নিবন্ধন ও ই-বাইক: ইলেকট্রিক গাড়ির নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদন শিল্পে কর রেয়াতের সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
৬. স্বর্ণ ও জুয়েলারিখাত
স্বর্ণ সরবরাহ ও ভ্যাট: স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে ৫ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.5 শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া জুয়েলারি সেবার ক্ষেত্রে ৫% ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে ২,৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর নির্ধারণ করা হতে পারে, যাতে কমতে পারে স্বর্ণের দাম।
৭. ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তি ও অন্যান্য পণ্য
ফ্রিজ-টিভি ও কম্পিউটার: টেলিভিশন, ফ্রিজ ও কম্পিউটার সামগ্রী উৎপাদনে কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল থাকছে। তবে কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও মনিটর আমদানির অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে।
এটিএম কার্ড ও শুল্ক প্রত্যাহার: এটিএম কার্ডসহ সব ধরনের কার্ড তৈরির কাঁচামালের ৫ শতাংশ আগাম কর এবং ১১৩টি পণ্যের ওপর থেকে ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে।
বাদ্যযন্ত্র ও গ্লাস শিল্প: বাদ্যযন্ত্র আমদানির ৫ শতাংশ শুল্ক এবং সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্সের ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে। ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে ব্যবহৃত ৫টি কাঁচামাল আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব আসছে।
প্যাকেজিং ও পরিবহন: প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ, পরিবহন ও গাড়ি ভাড়া সেবায় ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ এবং রিসাইকেলড পণ্য বা কাঁচামালের কর হার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। শোধনাগার বা রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের উৎসে করও ১.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে।
বাজেটে যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে
বাজেটের রাজস্ব ঘাটতি পূরণ এবং ক্ষতিকর বা বিলাসী পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে যেসব পণ্যের ওপর করের হার বাড়ানো হচ্ছে, ফলে দাম বাড়বে:
১. সিগারেট, নিকোটিন ও তামাকজাত পণ্য
কাঁচামাল ও শুল্ক: সিগারেটের ফিল্টার তৈরির কাঁচামালের ওপর ৩০০ শতাংশ এবং নিকোটিনের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। নিকোটিন পাউচের ওপর বসছে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক।
প্যাকেটের দাম ও ট্র্যাকিং: উচ্চ স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের দাম ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা করা হতে পারে এবং সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
২. অ্যালকোহল ও মদজাতীয় পানীয়
ভ্যাট আরোপ: দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহল বা মদের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব আসতে পারে, যা এর বাজারমূল্য বাড়িয়ে দেবে।
৩. কাজুবাদাম ও হিমায়িত মাছ
আমদানি শুল্ক: দেশীয় চাষীদের সুরক্ষায় কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্কহার ৫ শতাংশ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে।
হিমায়িত মাছ: বিদেশ থেকে আসা উচ্চ মূল্যের বিলাসী হিমায়িত মাছ আমদানির ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ মূসক বা ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে।
৪. নির্মাণ সামগ্রী বা রড শিল্প
উৎপাদন কর: আবাসন খাতের অন্যতম প্রধান উপাদান মাইল্ড স্টিল (এমএস) রড এবং এ জাতীয় পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর ও ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে, যার ফলে রডের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৫. বিলাসী ও বিদেশি প্রসাধনী
আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট: বিদেশি প্রসাধনী সামগ্রী, উচ্চমূল্যের বিলাসী খাবার এবং নতুন করে ১০টি পণ্যের আমদানি পর্যায়ে ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হতে পারে।
এমএ