ঢাকার কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবারের আলোচনাটা এখন আর শুধু সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। চালের দাম কত বাড়ল, বাজারের খরচ কীভাবে সামলানো যাবে, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল আবার বাড়বে কি না- এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে সচিবালয়ের কক্ষে বসে অর্থনীতিবিদ, আমলা ও নীতিনির্ধারকেরা হিসাব কষছেন ভিন্ন এক বাস্তবতা নিয়ে। কীভাবে রাজস্ব বাড়ানো যাবে? আইএমএফের সংস্কার শর্ত কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়িয়েও কীভাবে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে?
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট।
এটি শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়। এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং মানুষের প্রত্যাশার মধ্যকার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের পরীক্ষা।
সংখ্যার আড়ালের গল্প
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বড়। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের ভাষায় এটি "বড় সংখ্যার, কিন্তু কঠিন সিদ্ধান্তের বাজেট"। রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে সরকারকে সীমিত সম্পদ দিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- বাজার কি স্বস্তি দেবে? খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ভর্তুকি নয়; সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
২. রাজস্ব আদায় বাড়ানো
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন- করের আওতা বাড়ানো হবে কীভাবে?
নতুন কর আরোপ না করে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং কর ফাঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
৩. আইএমএফ সংস্কার বাস্তবায়ন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার এখন আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও নজরে। বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, কর অব্যাহতি পুনর্বিবেচনা এবং ভর্তুকি কাঠামো সংস্কারের মতো বিষয়গুলো সামনে এসেছে। এসব পদক্ষেপ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে।
৪. সামাজিকখাতে বিনিয়োগ
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ কমানো হলে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে। একটি আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা সামাজিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
তারা মনে করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য এসব খাতে ব্যয় বৃদ্ধি অপরিহার্য।
৫. রোহিঙ্গা সংকটের অর্থনৈতিক চাপ
বাংলাদেশ এখনও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায়িত্ব বহন করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তায় অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে, যার প্রভাব জাতীয় বাজেটেও পড়বে।
এই বাজেট কার জন্য?
সরকারের জন্য এটি বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা।
ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বিনিয়োগের বার্তা।
মধ্যবিত্তের জন্য এটি কর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি টিকে থাকার প্রশ্ন।
আর তরুণদের জন্য এটি কর্মসংস্থানের আশা।
বাস্তবায়ন কতটা কঠিন হবে?
বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়ন প্রায়ই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজস্ব ঘাটতি বহু বছর ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসল পরীক্ষা হবে বাজেট বক্তৃতায় নয়- এর বাস্তবায়নে।
সামনে কোন পথ?
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সুপারিশ অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়াই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নির্ধারণের দলিল।
ঢাকার বাজারে সবজির দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন একজন ক্রেতা থেকে শুরু করে নতুন চাকরির স্বপ্ন দেখা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী- সবার জীবনেই এর প্রভাব পড়বে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেট তাই শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের নথি নয়।
এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা।
আর সেই পরীক্ষায় সফল হওয়ার অর্থ হবে- সংকটের মধ্যেও আস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধিকে মানবিক করা এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
এমএ