একসময়ের সাধারণ কৃষক আব্দুস সাত্তার সানা এখন সাতক্ষীরার কলারোয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতির এক অনুকরণীয় রোল মডেল। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এলাকার অন্য কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে। কলারোয়া উপজেলার যুগীখালী ইউনিয়নের কামারালী গ্রামের এই সফল কৃষকের উদ্যোগে এলাকায় শুরু হয়েছে নিয়মিত ‘কৃষক দলগঠন’ সভা ও কৃষি সমাবেশ, যা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
শূন্য থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালে প্রথম কৃষিকাজে হাত দেন আব্দুস সাত্তার সানা। কঠোর পরিশ্রম ও মেধার জোরে তিনি এলাকায় গড়ে তোলেন এক বিশাল ‘সবজি সমারোহ মাঠ’। সবজি চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনের পর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। একে একে গড়ে তোলেন মৎস্য ঘের এবং গরু-ছাগলের খামার।
কৃষির আয় দিয়েই তিনি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং ছেলেকে একটি মুদি দোকান করে দিয়ে স্বাবলম্বী করেছেন। শুধু তাই নয়, নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে নতুন কৃষিজমি ক্রয় ও বন্ধক নিয়ে বর্তমানে তিনি এলাকায় একজন প্রতিষ্ঠিত ও স্বাবলম্বী ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত।
‘কৃষক প্রেমিক দল’ ও স্বেচ্ছাশ্রম
নিজে স্বাবলম্বী হয়েই ক্ষান্ত হননি সাত্তার সানা। নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা কলারোয়ার সাধারণ কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি গঠন করেছেন ‘কৃষক প্রেমিক দল’। এই দলের ব্যানারে তিনি নিয়মিত আয়োজন করছেন কৃষি পরামর্শ সভা ও সমাবেশ। তার সঠিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা পেয়ে এলাকার সাধারণ কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয়ে মাঠের পর মাঠ সবজি চাষ শুরু করেছেন। ফলে পুরো যুগীখালী ইউনিয়ন এখন কৃষিখাতে এক উর্বর অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
কৃষি বিপ্লবের পাশাপাশি সামাজিক ও স্বেচ্ছাশ্রমমূলক কাজেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই কৃষক। সম্প্রতি যুগীখালী ইউনিয়নের ওফাপুর মাঠপাড়া এলাকার মাঝের খালের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনি নিজ উদ্যোগে ১,৬৮০ মিটার দৈর্ঘ্য, ২৫ ফুট প্রস্থ এবং ৮ ফুট গভীরতার একটি বিশাল খাল পুনঃসংস্কার করেন। এতে এলাকার শত শত একর ফসলি জমি জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। বর্তমানে তিনি রিজার্ভার ও খাল খননের মাধ্যমে এলাকার চাষিদের পানির চাহিদা পূরণে কাজ করছেন।
এছাড়া ৬ বিঘা মিশ্র মৎস্য ঘেরের পাড়ে পড়ে থাকা আইল বা জমিতে শিমসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করে এলাকাবাসীকে তাক লাগিয়েছেন। এ কাজে সার্বিক সহযোগিতা করে আসছে টেকসই কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা উত্তরণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আব্দুস সাত্তার সানার নিঃস্বার্থ পরামর্শ এবং খালের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে তার দূরদর্শী পদক্ষেপের কারণে তারা এখন নির্বিঘ্নে ফসল ফলাতে পারছেন। সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই একজন ব্যক্তি কীভাবে পুরো এলাকার কৃষির চিত্র বদলে দিতে পারেন, সাত্তার সানা তার বাস্তব উদাহরণ। এলাকার কৃষকরা এখন তাকে একজন প্রকৃত ‘কৃষকবন্ধু’ হিসেবেই দেখছেন।
জেএ/আরএন