কাগজে-কলমে হাসপাতালটি ৫০ শয্যার হলেও বাস্তবে এর সেবার মান যেন জরাজীর্ণ কোনো ডিসপেনসারির চেয়েও নাজুক। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা এখন কেবলই হাহাকারের নাম। প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ অপারেশন থিয়েটার (ওটি), অচল এক্স-রে মেশিন ও জেনারেটর, আর তীব্র জনবল সংকটে এই উপকূলীয় জনপদের প্রায় দুই লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এখন খাদের কিনারায়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালটিতে ২৬ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও আছেন মাত্র ১৩ জন। নার্সিং সেবার চিত্র আরও ভয়াবহ—২৭ জন নার্সের স্থলে রয়েছেন মাত্র ১৪ জন। সম্প্রতি একসঙ্গে ১০ জন নার্স বদলি এবং ৩ জন ছুটিতে থাকায় ইনডোর, আউটডোর, শিশু বিভাগ ও লেবার ওয়ার্ডের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে পরিচ্ছন্নতা বিভাগ। ৫ জন সুইপারের বিপরীতে আছেন মাত্র ১ জন, ফলে পুরো হাসপাতাল চত্বরে সৃষ্টি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দুর্গন্ধ।
বিস্ময়কর হলেও সত্য, প্রায় এক যুগ ধরে আধুনিক মানের একটি অপারেশন থিয়েটার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় এর সব ইকুইপমেন্ট নষ্ট হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে মুমূর্ষু রোগীদের জেলা সদরে নেওয়ার জন্য যে অ্যাম্বুলেন্সটি রয়েছে, সেটিও অধিকাংশ সময় অচল থাকে। পর্যাপ্ত জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় সরকারি এই অ্যাম্বুলেন্সটি বছরের অধিকাংশ সময় গ্যারেজেই পড়ে থাকে। ফলে গরিব রোগীদের কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হচ্ছে।
#৫০ শয্যার হাসপাতালে ১ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী
#এক যুগ ধরে অপারেশন থিয়েটার বন্ধ
#নষ্ট হয়ে গেছে সকল প্রকার ইকুইপমেন্ট
#ডায়রিয়া ওয়ার্ডে একসঙ্গে রাখা হচ্ছে নারী-পুরুষ
#লোকলজ্জার শিকার নারী রোগীরা
অন্যদিকে, তেল বরাদ্দের অভাবে দীর্ঘ এক যুগ ধরে বিকল পড়ে আছে হাসপাতালের জেনারেটর। বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতাল চত্বর অন্ধকারে ঢেকে যায় এবং তা মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়, যা রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন পানির অভাব পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে।
সুইপার সংকটের কারণে বাথরুম ও টয়লেটগুলো এতটাই অপরিচ্ছন্ন যে রোগীরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না। সুস্থ হতে এসে পরিবেশগত কারণে রোগীরা উল্টো নতুন সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছেন। আউটডোরে প্রতিদিন শত শত রোগী এলেও চিকিৎসকের অভাবে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করেও অনেকেই চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী মানসুরা বেগম (৫৫) বলেন, “আমার বাড়ি সুন্দরবনের পাশে। অসুস্থ হয়ে অনেক কষ্ট করে হাসপাতালে এসেছি। এখানে এসে আমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছি। ঠিকমতো ওষুধ পাই না, ডাক্তার আসে না, নার্সদের কিছু বললে তারা ঠিকমতো উত্তরও দেন না। বাথরুম ব্যবহার করা যায় না, পানি নেই, দুর্গন্ধে টিকে থাকা যায় না। আল্লাহ যেন আমাকে আর এই হাসপাতালে না আনেন।”
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আনোয়ারা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছি, কিন্তু এখানে থাকা যায় না। পরিবেশ নোংরা, তার ওপর লোকলজ্জার শিকার হতে হচ্ছে। এটি মহিলা ডায়রিয়া ওয়ার্ড হওয়া সত্ত্বেও এখানে নারী ও পুরুষ রোগীদের একসঙ্গে রাখা হচ্ছে। এতে পর্দার নিরাপত্তা নেই। একজন নারী হিসেবে এই পরিবেশে চিকিৎসা নেওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক।”
উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন পঞ্চায়েত এই অব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “৫০ শয্যার এই হাসপাতালে মানুষ সেবা পায় না, পায় কেবল দুর্গন্ধ আর আশ্বাস। প্রায় এক যুগ ধরে ওটি ও জেনারেটর বন্ধ থাকা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা এই প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয় গোপাল বিশ্বাস বলেন, “তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। পাশাপাশি নার্সের তীব্র সংকটও রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, তবে পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”
এমআর/আরএন