নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদীতে খনন (ড্রেজিং) প্রকল্পের আড়ালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাটসংলগ্ন এলাকায় রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করায় নদীভাঙনের শঙ্কায় পড়েছে স্থানীয় জনপদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অনুমোদিত নদী খননের কাজের সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন করে অন্যত্র বিক্রি করছে। এতে নদীর তীর দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, আনন্দবাজার হাটের পাশেই ড্রেজিংয়ের বালু ফেলে ডাম্পিং করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা করা হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর থেকেই ২০ থেকে ২৫টি শক্তিশালী ড্রেজার দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করে বাল্কহেডে করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে আনন্দবাজার হাট ছাড়াও ছনপাড়া, টেকপাড়া, খামারগাঁও ও পূর্ব দামোদরদী এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে মেঘনা এলপিজি ও আমান সিমেন্ট কোম্পানির স্থাপনাও।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএ থেকে মুন্সিগঞ্জের ‘চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রাইভেট) লিমিটেড’ নদী খননের কার্যাদেশ পায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে রাতের বেলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় সোনারগাঁও ও মেঘনা উপজেলার কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলেছেন এলাকাবাসী। যদিও অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ব্যবসায়ী মোমেন সিকদার বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী নদী খননের কাজ চলছে। আমি শুধু কাজটি দেখভাল করেছি। বর্তমানে অন্যরা কাজ পরিচালনা করছে। কেউ যদি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে, তার দায়ভার আমার নয়।”
পিরোজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও যুবদল নেতা মাসুম রানা বলেন, “আমি বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নই। সেখানে শুধু আমার ড্রেজার ভাড়া দেওয়া হয়েছে।”
পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, “রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে বালু লুট করা হচ্ছে। এতে নদী, পরিবেশ ও জনবসতি হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে তাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
সোনারগাঁও পৌরসভা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ফরহাদ শিকদারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নারায়ণগঞ্জের উপ-পরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, “অভিযোগের ভিত্তিতে আনন্দবাজার এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে একটি ড্রেজার বৈধভাবে কাজ করছে। তবে রাতে যে বালু উত্তোলন হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সোনারগাঁও থানার ওসি গোলাম সারোয়ার জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে পুলিশ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে।
সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতি সাপেক্ষে নদী খননের কাজ চলছে। তবে রাতের আঁধারে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। নদীতে রাতে অভিযান পরিচালনায় কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও আমরা চেষ্টা করছি।”
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, “রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এইচএমআর/এসআর