ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
গুরুদাসপুরে দুই ভাইয়ের ব্যতিক্রমী খামার বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ৫:০২ পিএম
X

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দুম্বাকে ঘিরে জমে উঠেছে নাটোরের এক ব্যতিক্রমী পশুখামার। আর সেই খামার ঘিরেই চলছে ব্যাপক আলোচনা। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার উচ্চশিক্ষিত দুই ভাইয়ের হাতে গড়ে ওঠা এই খামারের গল্প যেন গ্রামীণ উদ্যোক্তা সাফল্যের এক অনন্য উদাহরণ। মাত্র চারটি ছাগল দিয়ে শুরু হওয়া ছোট্ট উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে দুই শতাধিক পশুর আধুনিক ও সুপরিকল্পিত খামারে। প্রায় তিন দশকের নিরলস পরিশ্রম, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও অদম্য সাহসিকতায় গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ শুধু একটি পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতাই আনেনি, বদলে দিতে শুরু করেছে পুরো এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খামার পাথুরিয়া গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সবুজ প্রান্তরজুড়ে বিস্তৃত ৩২ বিঘা জমির বিশাল প্রাণিসম্পদ খামার। গরু, ছাগল, গাড়ল ও মরুভূমির প্রাণী দুম্বা নিয়ে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী খামারে প্রতিদিনই ভিড় করছেন উৎসুক দর্শনার্থী ও ক্রেতারা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন শুধু একনজর দেখতে—কীভাবে চারটি ছাগল থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সফলতার এক অনন্য সাম্রাজ্য।

গ্রামের সাধারণ দুই ভাই—আনোয়ার হোসেন ও হান্নান সরকারের দীর্ঘ সংগ্রাম, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং নিরলস শ্রমে গড়ে ওঠা এই খামার এখন এলাকায় সফল উদ্যোক্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে মাত্র চারটি ছাগল দিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন আনোয়ার হোসেন ও তাঁর ভাই হান্নান সরকার। তখন অভাব-অনটনের সংসারে টিকে থাকাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দারিদ্র্যের কাছে হার না মেনে তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাবলম্বী হওয়ার। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে ৩২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা আধুনিক প্রাণিসম্পদভিত্তিক বৃহৎ খামারে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া আনোয়ার হোসেন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন পরিশ্রমী ও আত্মপ্রত্যয়ী। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই তিনি পশুপালনে মনোযোগ দেন। শুরুতে অর্থসংকট, পশুর রোগব্যাধি, খাদ্যসংকট ও লোকসানের মতো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। এমনকি সামাজিক কটূক্তিও সহ্য করতে হয়েছে। তবুও থেমে যাননি তারা। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সুপরিকল্পিত খামার।

বর্তমানে খামারটিতে বিভিন্ন উন্নত জাতের গরু, ছাগল, গাড়ল ও দুম্বাসহ দুই শতাধিক পশু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখন মরুভূমির প্রাণী দুম্বা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এসব দুম্বা দেখতে প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষের ভিড়।

আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই হান্নান সরকার জানান, মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর দুই-তিনটি ছাগল পালন দিয়েই শুরু হয়েছিল তাদের যাত্রা। পরে ২০১০ সালে বড় পরিসরে খামার গড়ে তোলেন তারা। ব্যবসায়ীদের সহায়তায় ভারত থেকে সংগ্রহ করেন তিনটি মাদি ও একটি পুরুষ দুম্বা। সেই চারটি দুম্বা থেকেই বর্তমানে তাদের খামারে প্রায় ৬০টি দুম্বা রয়েছে।

তিনি জানান, আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে প্রায় ৩৬টি দুম্বা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। জাত, আকার ও ওজনভেদে এসব দুম্বার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা খামারে আসছেন। অনেকে আবার পরিবার নিয়ে আসছেন ব্যতিক্রমী এই প্রাণীগুলো দেখতে।

হান্নান সরকার বলেন, “শুরুতে মানুষ দুম্বা সম্পর্কে খুব বেশি জানত না। কিন্তু এখন কোরবানির পশু হিসেবে দুম্বার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আমাদের খামারে আসছেন। অনেকে এখান থেকে দুম্বা নিয়ে নিজেরাও খামার শুরু করছেন।”

তিনি আরও বলেন, গত কোরবানির ঈদে নিজেদের ও আশপাশের খামারিদের মিলিয়ে প্রায় ৮০টি দুম্বা বিক্রি হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন তারা।

খামারের প্রাণীগুলোকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানো হয়। প্রতিদিন খড়, ভূষি ও তাজা ঘাস সরবরাহ করা হয়। পশুর খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রায় সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ করেছেন তারা।

বর্তমানে খামারটিতে ২৩ জন শ্রমিক কাজ করছেন। এদের অধিকাংশই স্থানীয় বেকার যুবক। খামারের শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, “এখানে কাজ করতে এসে প্রথম দুম্বা দেখেছি। এখন নিয়মিত পরিচর্যা করি। ঈদের সময় কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়, তবে এই খামার আমাদের জীবিকার বড় ভরসা।”

শুধু নিজেদের খামারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি আনোয়ার হোসেন। এলাকার তরুণদের খামার গড়ে তুলতে পরামর্শ ও সহযোগিতাও করছেন নিয়মিত। তাঁর অনুপ্রেরণায় এলাকায় আরও কয়েকটি ছোট-বড় খামার গড়ে উঠেছে। ফলে খামারকেন্দ্রিক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে পুরো এলাকায়।

আনোয়ার হোসেন বলেন, “শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে যুবসমাজ যদি কৃষি ও খামারভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে এগিয়ে আসে, তাহলে বেকারত্ব অনেক কমে যাবে। আমি বিশ্বাস করি, পরিশ্রম ও সততা থাকলে সফলতা আসবেই।”

খামারটি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা এলাকার মানুষ। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থী কবির হোসেন ও রবিন মোল্লা বলেন, “দুম্বার কথা আগে শুধু ভিডিওতে দেখেছি। নাটোরে এসে সরাসরি দুম্বা দেখলাম। এটি সত্যিই সম্ভাবনাময় একটি খাত।”

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, “দুম্বা মূলত শুষ্ক অঞ্চলের প্রাণী হলেও বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে এখন ভালোভাবেই মানিয়ে নিচ্ছে। গুরুদাসপুরে বড় পরিসরে দুম্বা পালন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তর খামারিদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছে।”

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে নাটোর জেলায় ২১ হাজার ৩৭৪টি খামারে মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪৪৭টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার চাহিদা ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬১১টি হলেও উৎপাদন হয়েছে চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। উদ্বৃত্ত পশু রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে।

চারটি ছাগল থেকে শুরু হওয়া আনোয়ার-হান্নান ভাইদের এই সাফল্যের গল্প এখন শুধু একটি পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাহিনি নয়; এটি গ্রামীণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির এক অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত। তাদের খামার যেন প্রমাণ করে—পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে গ্রামের মাটিতেও গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনার নতুন সাম্রাজ্য।

এমএ/আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝