পটুয়াখালীর দশমিনায় পরীক্ষামূলকভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আঙুর চাষে সফল হয়েছেন কৃষি উদ্যোক্তা কাওসার আলম আকরাম (৫২)। তার এ সফলতা উপজেলায় রীতিমতো আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের বাসিন্দা আকরাম রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় ষ্টোর কিপার পদে চাকুরি করতেন। চাকরি ছেড়ে তিনি নিজ এলাকায় এসে ব্যতিক্রমী ফল-ফসল উৎপাদনের স্বপ্ন দেখেন। পরে ইউটিউব দেখে আঙুর চাষে উদ্ধুদ্ধ হন তিনি।
দ্য ডেইলি অবজারভারকে তিনি বলেন, মূলতঃ ইউটিউব দেখেই আঙুর চাষে উদ্ধুদ্ধ হই। পরে যশোর থেকে সাদা আঙুরের চারা আনি। যখন ফল আসে তখন আরও উৎসাহিত হয়ে রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় গিয়ে বড় একটি বাণিজ্যিক বাগান পরিদর্শন করি।
তিনি আরও জানান, গত বছর আষাঢ় মাসে আমার বসত বাড়ির দক্ষিণ পাশে ১৫ শতাংশ জমিতে ৭০ টি বাইকুনুর জাতের আঙুরের চারা লাগিয়েছি। জাতটির ফল খয়েরি রঙের। দেশের আনাচে কানাচে সবখানেই একটু উঁচু জমিতে এটি ভালো জন্মে। এ জাতটি বছরের বারো মাসই ফল দেয়। গাছগুলোতে এবার প্রথম ফলন আসছে। স্বাদও খুব মিষ্টি। একেকটা গাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ কেজি আঙুর পাবো। এছাড়াও ব্ল্যাক ম্যাজিক, জয় সিডলেস (ব্ল্যাক), গ্রীণ লং, অষ্ট্রেলিয়ান কিং, ভাইকিং-২, ডরিনা ও চয়ন জাতের ২০০ টি চারা লাগিয়েছেন তিনি। পরিচর্যাসহ এ যাবত প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে তার। তবে প্রতিটি আঙুরের স্বাদ অনেক মিষ্টি হওয়া সত্ত্বেও এ বছর কোনো আঙুর বিক্রি করেননি তিনি। আত্মীয়-স্বজন ও আগত দর্শনার্থীদেরকে বিনামূল্যে খাওয়াচ্ছেন এবং উপহার হিসেবে দিচ্ছেন এসব আঙুর।
জানা যায়, আরও প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে ৫০০ গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন আকরাম।
আকরাম বলেন, উপজেলা কৃষি বিভাগ আমাদের সহযোগিতা করে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি আমাকে একটি পলিনেট হাউস করে দেয় তাহলে আমি বছরে এখানে দু’বার আঙুর চাষ করতে পারবো। সারা বছর আমার বাগানে আঙুর থাকবে। আঙুর এমন একটি ফল যা বৃষ্টি পেলে ফেটে যায়।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আকরামের আঙুর চাষের খবর ছড়িয়েছে। ফলে বাগান দেখতে আসছেন অনেকেই। বিনামূল্যে খেয়ে যাচ্ছেন ফল।
বাগান দেখতে আসা উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী জাহিদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, আকরামের আঙুর বাগানে এসে অভিভূত হলাম। থোকায় থোকায় ঝুলে আছে কাঁচা পাঁকা টসটসে আঙুর। দেশের মাটিতে এমন দৃশ্য দেখার সাধ বহু দিনের। এখানের মাটিতে যে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে, আকরামের বাগানের ফলনই বলে দিচ্ছে সেই কথা।
স্কুল শিক্ষিকা শারমিন বলেন, যে আঙুর আমরা বাজার ছাড়া দেখিনা সেটি এখন এখানের মাটিতে চাষ-রোপিত গাছ থেকে ছিড়ে খাচ্ছি, এটি আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মো. উজ্জ্বল হোসেন দ্য ডেইলি অবজারভারকে বলেন, আঙুর মূলত শীতপ্রধান অঞ্চলসমূহের ফল। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে সাথে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সফলভাবে আঙুর চাষ করা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও কৃষির বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে আঙুর চাষ একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে ধীরে ধীরে আশাব্যঞ্জক পরিচিতি পাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আঙুর ভবিষ্যতে আমদানী নির্ভরতা হ্রাস করতে সহায়ক হবে। এছাড়া উপযুক্ত বাজারমূল্য, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে একজন কৃষি উদ্যোক্তা অল্প জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে আঙুর চাষ করে তুলনামূলক কম সময়ে বেশি লাভবান হবে, যা নতুন কর্মসংস্থান তৈরীতে সহায়ক হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করবে।
আঙুর চাষে আকরামকে সবধরনের কৃষি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ অবজারভারকে বলেন, গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে আঙুর চাষের চেষ্টা চলছে। আঙুরের ফলন হয়েছে ঠিকই কিন্তু স্বাদ ছিলো বেজায় টক। ফলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষের উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখেনি। এরপর বহুবার ছাদ কৃষিতে বা বিচ্ছিন্নভাবে আঙুরের চাষ হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে আমাদের কৃষি উদ্যোক্তারা নতুন নতুন ফল-ফসলের চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। অবশেষে ৩০-৩৫ বছর পর দেশের মাটিতে যখন বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের সম্ভাবনা থেকে সফলতার গল্প লিখেছেন কয়েকটি জেলার কতিপয় কৃষি উদ্যোক্তাগণ, ঠিক তখনই পটুয়াখালীর দশমিনায় আঙুর চাষে সম্ভাবণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন কাওসার আলম আকরাম।
এসটি/এসআর