সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলা সীমান্ত এখন এক ‘অদৃশ্য চোরাচালান করিডরে’ পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই এই সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে শক্তিশালী একটি চোরাকারবারি চক্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও নজরদারি এড়িয়ে মাদক, গবাদিপশু, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন ভারতীয় নিষিদ্ধ পণ্য অবাধে দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে ভারতীয় গরুকে দেশীয় হিসেবে বৈধতা দেওয়ার এক অভিনব কৌশল ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা বোগলাবাজার এলাকার পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত দুর্গম পথকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বাণিজ্য চলছে।
অভিযোগ উঠেছে, সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় গরু প্রথমে বোগলাবাজারের বিভিন্ন খামারে রাখা হয়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা বা এক রাত অবস্থানের পরই ‘বিদেশি’ গরুকে ‘দেশি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এরপর স্থানীয় হাটে তুলে সেগুলোকে বৈধতা দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কিছু ইজারাদার ও খামারি সরাসরি জড়িত বলে জানা গেছে। প্রতিটি গরু খামারে রাখার বিনিময়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই এলাকার আটটি খামারের মধ্যে চারটি অনিবন্ধিত। দিনের বেলায় এসব খামারে তেমন কোনো কার্যক্রম না থাকলেও রাতের আঁধারে গরু আনা-নেওয়ার ধুম পড়ে যায়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দোয়ারাবাজার উপজেলায় বছরে প্রায় ছয় হাজার গবাদিপশু উৎপাদন হয়। অথচ বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি হাটে যে পরিমাণ গরু কেনাবেচা হয়, তার বার্ষিক হিসাব সরকারি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে বহুগুণ ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয়দের প্রশ্ন— স্থানীয় উৎপাদনের বাইরে এই বিশাল সংখ্যক গরু আসছে কোথা থেকে?
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আবু হেলাল মোস্তফা জানান, খামারগুলো পশুপালনের উদ্দেশ্যে নিবন্ধন পেলেও বর্তমানে সেগুলোকে অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে দোয়ারাবাজার থানার ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিংহ জানান, বোগলাবাজারে ভারতীয় গরু ঢোকার খবর তিনি পেয়েছেন। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়েছে এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সীমান্তের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, খামার ও হাটের আড়ালে চলা এই জালিয়াতি বন্ধে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় খামারিরাও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়বেন।
এমবি/আরএন