বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় ১৬টি চালু কমিউনিটি ক্লিনিকের সবগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে। প্রায় ৯ মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় কেবল পরামর্শ দিয়েই চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ফকিরহাট উপজেলার জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৯ হাজার। স্থানীয় স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকই প্রাথমিক চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থল।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ১৬টি চালু কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রায় ৯ মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পানির সংকট, অচল শৌচাগার, জনবল ঘাটতি ও অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এতে দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফকিরহাটের আটটি ইউনিয়নে মোট ১৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ভবনা কমিউনিটি ক্লিনিক দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে বন্ধ রয়েছে। বাকি ১৬টি ক্লিনিকে একজন করে সিএইচসিপি (কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার) সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের কথা। পাশাপাশি সপ্তাহে তিন দিন পরিবারকল্যাণ সহকারী ও স্বাস্থ্য সহকারীর সেবা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীরা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না বা নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান।
ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ সুকুমার ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৬টি চালু ক্লিনিকের সবকটিই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে তিনটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, পাঁচটি মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ এবং আটটি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ক্লিনিকগুলো হলো শুভদিয়া, হোচলা ও ফলতিতা কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই প্রতিদিন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সাধারণত ২২ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও ২০২৫ সালের আগস্টের বরাদ্দের পর আর কোনো ওষুধ আসেনি। ফলে দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস ধরে রোগীদের কেবল পরামর্শ দিয়েই ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের।
মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে হোচলা কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, জীর্ণ ও স্যাঁতসেঁতে একটি ভবনে চিকিৎসাসেবা চলছে। ভবনের দেয়াল ও ছাদে বড় বড় ফাটল দেখা গেছে। দক্ষিণ পাশ কিছুটা হেলে পড়েছে। জানালার কাঠামো মরিচায় ক্ষয়ে গেছে। শৌচাগারের মেঝে ফেটে উঁচু-নিচু হয়ে যাওয়ায় সেটি ব্যবহার অনুপযোগী। ক্লিনিকটিতে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অবস্থান করছেন।
সেখানে দায়িত্বরত সিএইচসিপি উপস্থিত থাকলেও স্বাস্থ্য সহকারীর পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, আগের কর্মী অবসরে যাওয়ার পর নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
সকাল থেকেই কয়েকজন নারী-পুরুষ চিকিৎসা নিতে ক্লিনিকে আসেন। দায়িত্বরত সিএইচসিপি জান্নাতুল মেওয়া রোগীদের রক্তচাপ ও প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে পরামর্শ দেন। তবে ওষুধ চাইলে রোগীদের জানানো হয়, কোনো সরবরাহ নেই। এতে অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যান।
বৈলতলী গ্রামের গৃহিণী সোনিয়া বেগম বলেন, “অসুস্থ শরীরে প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে চিকিৎসা নিতে এসেছি। আগে এখানে বিনা মূল্যে ওষুধ পেতাম। এখন শুধু পরামর্শ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উপজেলা হাসপাতাল অনেক দূরে, সেখানে যাওয়া আমাদের জন্য খুব কষ্টের।”
হোচলা গ্রামের আজিম শেখ বলেন, “আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আগে অসুখ হলে এখান থেকে ডায়রিয়া, জ্বর, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ পেতাম। এখন ৮-৯ মাস ধরে কিছুই পাই না। বাজার থেকে ওষুধ কিনতে গেলে সংসারে চাপ পড়ে।”
শুভদিয়া এলাকার বৃদ্ধা জয়নব খাতুন বলেন, “আগে ক্লিনিক থেকে চিকিৎসা ও ওষুধ পেতাম। এখন ওষুধ না থাকায় বাধ্য হয়ে ফকিরহাট সদর হাসপাতালে যেতে হয়। যাওয়া-আসায় প্রায় ৫২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়, যা আমাদের মতো বয়স্ক মানুষের জন্য খুব কষ্টের।”
দায়িত্বরত সিএইচসিপি জান্নাতুল মেওয়া বলেন, “সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ওষুধ গ্রহণ করেছি, সেটিও আগস্ট মাসের বরাদ্দের। এরপর আর কোনো ওষুধ আসেনি। রোগীরা ওষুধ চাইলে দিতে পারি না। আগে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী আসতেন, এখন তা কমে ১০ থেকে ১৫ জনে নেমে এসেছে।”
তিনি আরও জানান, সিএইচসিপিদের সাড়ে পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে, ফলে তারা আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর দেবজার মিত্র বলেন, উপজেলার অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থাই প্রায় একই রকম।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান সাগর জানান, ওষুধ সংকট, অবকাঠামোগত ঝুঁকি এবং সেবার মান কমে যাওয়ায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে রোগী আসার হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে গেছে। ফলে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে অনেককে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে।
বাগেরহাট জেলা সিভিল সার্জন ডা. আ. স. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, “শুধু ফকিরহাট বা বাগেরহাটে নয়, বিভিন্ন জায়গায় ওষুধ সরবরাহে সমস্যা রয়েছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সরকারি সরবরাহ পেলেই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ পাঠানো হবে।”
এএ/আরএন