ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
রাজনীতিতে নারীর বাস্তব ক্ষমতায়নের প্রভাব কতটুকু অর্জিত হয়েছে?
✎ শাহরিন হক
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৮:৩৫ পিএম
X

বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতির গল্প আমরা প্রায়ই গর্বের সঙ্গে বলি—শিক্ষা, অর্থনীতি, এমনকি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বেও নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি আছে। কিন্তু বাস্তবতার ভেতরে ঢুকলেই প্রশ্নটা সামনে আসে: এই উপস্থিতি কি সত্যিই ক্ষমতায় রূপ নিয়েছে, নাকি তা অনেকটাই প্রতীকী? সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—সংখ্যা দিয়ে অন্তর্ভুক্তি দেখানো সহজ, কিন্তু ক্ষমতা, কণ্ঠ ও প্রভাব নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভোটার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হলেও সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা সীমিত থেকে গেছে- যা বোঝায়, সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতার সুযোগ নারীদের জন্য এখনো সমানভাবে তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নারীরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েন, আর নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাস্তব পরিবেশও তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকূল থেকে যায়। ফলে নির্বাচনের পর সংসদে নারীর উপস্থিতি থাকলেও, সেই উপস্থিতির বড় অংশ ভিন্ন একটি কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা আমাদের নিয়ে আসে সংরক্ষিত আসনের প্রশ্নে। জাতীয় সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী সদস্য সরাসরি ভোটে নয়, বরং দলীয় অনুপাতের ভিত্তিতে মনোনীত হন। এই ব্যবস্থা নারীর উপস্থিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এখানেই ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। কারণ সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতো তাদের নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থাকে না—ফলে জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

তাই জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল এবং সংসদের কাঠামো একসঙ্গে দেখলে একটি পরিষ্কার চিত্র ফুটে ওঠে- একদিকে নারীদের সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ কম, অন্যদিকে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এই পূরণটি সংখ্যায় হলেও, প্রভাবের জায়গায় সেই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। সংসদে উপস্থিতি থাকলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।

সমস্যাটি শুধু নির্বাচনী কাঠামোয় নয়; এর শিকড় আরও গভীরে। সমাজে এখনো লিঙ্গভিত্তিক ধারণা শক্তভাবে কাজ করে—নেতৃত্বকে অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে বেশি মানানসই হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে, ফলে নারীরা প্রার্থী হওয়ার আগেই অদৃশ্য এক বাধার মুখে পড়ে যান। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি এবং পারিবারিক-সামাজিক চাপ-যা নারীদের জন্য রাজনীতির পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

একইসঙ্গে বাস্তবে দেখা যায়, সংরক্ষিত আসনের অনেক নারী সংসদ সদস্য সংসদে উপস্থিত থাকলেও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রীয় জায়গাগুলোতে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, দলীয় সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ কাঠামো-এই জায়গাগুলোতে তাদের প্রবেশ সীমিত থাকে। ফলে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও তা সবসময় কার্যকর প্রভাব তৈরি করতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়-নারীর ক্ষমতায়ন কেবল কোটা বা উপস্থিতির বিষয় নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামোয় তাদের বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, নারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ, আর্থিক ও নিরাপত্তাগত সহায়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।

স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীদের জন্য একটি ধারাবাহিক নেতৃত্বের পথ তৈরি করা গেলে, তারা শুধু অংশগ্রহণই করবেন না—ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রেও জায়গা করে নিতে পারবেন। আর তখনই প্রতীকী উপস্থিতি থেকে বাস্তব ক্ষমতায়নের যাত্রা সত্যিকার অর্থে শুরু হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি এখন আর প্রশ্নের বিষয় নয়—প্রশ্ন হচ্ছে তাদের ক্ষমতা কতটা বাস্তব। কারণ গণতন্ত্র তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিনিধিত্ব শুধু সংখ্যায় নয়, প্রভাবেও প্রতিফলিত হয়।

এই প্রভাবের প্রশ্নটি আসলে বহুমাত্রিক। সংসদে কতজন নারী আছেন—এটি একটি দৃশ্যমান সূচক, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কতটা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারছেন, কতটা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারছেন এবং কতটা নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারছেন। যদি কোনো প্রতিনিধি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে না থাকেন, যদি তার কণ্ঠ দলীয় বা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ভেতর আটকে থাকে, তাহলে তার উপস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের পূর্ণতা এনে দেয় না।

এখানেই বাস্তব ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। নারীরা যেন শুধু নির্বাচিত বা মনোনীত হয়ে সংসদে না আসেন, বরং তারা যেন আইন প্রণয়ন, বাজেট আলোচনা, কমিটির নেতৃত্ব—এই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজন তাদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দলীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তি এবং এমন একটি পরিবেশ যেখানে তাদের মতামত গুরুত্ব পায়, কেবল আনুষ্ঠানিকতার অংশ হয়ে থাকে না।

একইসঙ্গে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সমাজের সামগ্রিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে। পরিবার, শিক্ষা, গণমাধ্যম—সব জায়গায় যদি নারীর নেতৃত্বকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে। অর্থাৎ, ক্ষমতায়ন কেবল সংসদের ভেতরের বিষয় নয়; এটি সমাজের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া।

সব মিলিয়ে, এখন সময় এসেছে সংখ্যার সাফল্য থেকে প্রভাবের সাফল্যের দিকে যাত্রা করার। নারীরা রাজনীতিতে আছেন-এটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু তারা কতটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কতটা নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলছেন-সেই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও পরিপূর্ণ, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝