একসময় নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা শান্ত-নিরিবিলি জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষ দিনের পরিশ্রম শেষে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন রাত নামলেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের আতঙ্কে ভুগছেন সাধারণ মানুষ।
গত কয়েক মাসে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, বাজার ও গ্রামাঞ্চলে ধারাবাহিক অপরাধের ঘটনায় জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে। রাতের সড়কে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন চালক ও যাত্রীরা।
সম্প্রতি গুরুদাসপুর পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে গভীর রাতে সংঘবদ্ধ ডাকাতদল একাধিক বাড়িতে হানা দেয়। স্থানীয়দের দাবি, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়। একই সময়ে আনন্দনগর এলাকায় এক রাতেই একটি বাড়ি থেকে ছয়টি দুধেল গাভী চুরির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
আজ বুধবার (৬ মে) ভোর রাতে পৌর এলাকায় পৃথক কয়েকটি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চাঁচকৈড় বাজারে এক রসুন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে এক ইমামের মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনতাই এবং একটি অটোরিকশা চুরির ঘটনাও ঘটে।
এর আগে গত ১৫ দিনে পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রয়েছে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতি, দুই মহিলা কলেজ শিক্ষকের নামে কাফনের কাপড় পাঠানো, এক এসআইকে অস্ত্রের মুখে ছিনতাই, আনসার-ভিডিপি ও ভূমি অফিস থেকে ল্যাপটপ চুরি, মডেল মসজিদের সরঞ্জাম চুরি এবং সরকারি কোয়ার্টারে হাত-পা বেঁধে ডাকাতির ঘটনা।
গত ২ মে রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের সরকারি বাসভবনে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে বেঁধে ও তার স্ত্রীর গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে। এর আগে ১৫ এপ্রিল থানার অদূরে সোনাউল্লা বাড়িসহ বেশ কয়েকটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে ডাকাতি করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করা হয়। তবে এসব ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ এবং অধিকাংশ লুট হওয়া মালামালও উদ্ধার হয়নি।
এদিকে বিভিন্ন সড়কে মোটরসাইকেলযোগে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতাও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ফাঁকা সড়ক পেলেই দুর্বৃত্তরা পথরোধ করে টাকা, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা ছিনিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে বিলাঞ্চল ও গ্রামীণ সড়কে রাতের চলাচল এখন আতঙ্কের নাম।
চাঁচকৈড় বাজার, খুবজীপুর, ধারাবারিষা, নাজিরপুর, মশিন্দা ও বিয়াঘাটসহ চলনবিল অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের ভয় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, “আগে রাত ১০–১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকত। এখন সন্ধ্যার পরই মানুষ বাসায় চলে যায়।” অটোরিকশা চালক বেলাল হোসেন বলেন, “রাতে যাত্রী নিয়ে দূরে যেতে ভয় লাগে। কোথায় কখন ছিনতাই হবে বলা যায় না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় আগের তুলনায় পুলিশি টহল কমে গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়ক ও বিলাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কম থাকায় অপরাধীরা সহজেই সুযোগ নিচ্ছে।
তবে গুরুদাসপুর থানার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি গঠন করে অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করার কথা জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, “গুরুদাসপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত সভা, নজরদারি ও সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব, মাদক বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ, কমিউনিটি পুলিশিং, সিসিটিভি স্থাপন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি।
গুরুদাসপুরের মানুষ এখন নিরাপদ জীবন ও অপরাধমুক্ত পরিবেশ প্রত্যাশা করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না হলে আতঙ্ক আরও বাড়বে।
এমএ/আরএন