ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে সীমান্ত নদী পুনর্ভবার পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার নদীসংলগ্ন বিলাঞ্চলে উঠতি শত শত বিঘা বোরো ধান হুমকির মুখে পড়েছে।
গত দুই দিনে পুনর্ভবা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের বিল কুজইনে রোপণ করা প্রায় ৫০০ বিঘা বোরো ধান নিমজ্জিত হয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আরও শত শত বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দিনাজপুর থেকে প্রবাহিত পুনর্ভবা নদীর পানি গত কয়েকদিন ধরে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা এবং গোমস্তাপুর উপজেলার নদীসংলগ্ন নিম্ন ও বিলাঞ্চলে রোপণ করা উঠতি বোরো ধান নিমজ্জিত হয়ে গেছে।
ধানকাটা শ্রমিক সংকটের মধ্যে এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে মাঠে থাকার কথা ছিল উৎসবের আমেজ, পাকা বোরো ধানের সোনালি ঢেউ আর ঘরে তোলার ব্যস্ততা—সেখানে এখন বিস্তীর্ণ মাঠ পরিণত হয়েছে নিঃশব্দ জলরাশিতে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় রোববার রাত থেকে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে পুনর্ভবা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের মাঝে হতাশা নেমে এসেছে।
সোমবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। মাঝেমধ্যে ডুবে থাকা ধানের শীষ যেন শেষ চেষ্টা করছে মাথা তুলে দাঁড়ানোর, কিন্তু প্রকৃতির কাছে সেই লড়াই অত্যন্ত অসহায়।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলার বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলের বোরো ধান হঠাৎ নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় পানিতে তলিয়ে গেছে। কাটার উপযোগী ধান ঘরে তোলার আগেই এমন বিপর্যয় কৃষকদের জন্য নির্মম আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ওসমান আলী বলেন, “সারা বছরের কষ্ট করে চাষ করা ধান এভাবে পানির নিচে চলে যাবে, কখনো ভাবিনি। আর কয়েকটা দিন সময় পেলেই আমরা ধান ঘরে তুলতে পারতাম।” তিনি আরও বলেন, “এখন আমাদের সামনে শুধু ঋণের বোঝা আর অনিশ্চয়তা।”
আরেক কৃষক সবুর আলী জানান, “আমরা ধারদেনা করে চাষাবাদ করি। ফসলটাই যদি না পাই, তাহলে সংসার চালাবো কীভাবে?” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিবছর একই সমস্যা হয়, কিন্তু এর কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না।”
স্থানীয় বাসিন্দা মোমিন বলেন, “পুনর্ভবা নদীর পানি বাড়লেই এই বিল এলাকা প্লাবিত হয়। একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় পানি ঠিকমতো নামতে পারে না। দ্রুত সেতু নির্মাণ করা গেলে কৃষকদের এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনর্ভবা নদীর পানি বাড়লেই প্রতিবছর এমন দুর্ভোগ নেমে আসে। নদীর উভয় পাড়ে স্থায়ী বাঁধ ও স্লুইসগেটের অভাবে পানি উপচে নিম্ন বিলাঞ্চলে প্রবেশ করে দ্রুত প্লাবনের সৃষ্টি হয়। তারা মনে করেন, দ্রুত টেকসই সেতু, বাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই উন্নত হবে না, বরং এ ধরনের দুর্যোগের প্রভাবও অনেকাংশে কমে আসবে।
সোমবার ও মঙ্গলবার পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. মিজানুর রহমান, গোমস্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আশরাফ হোসেন আলীম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সি এবং কৃষি কর্মকর্তা সাকলায়েন হোসেন।
তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সহায়তার আশ্বাস দেন।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাকলাইন হোসেন জানান, পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ধান রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সি বলেন, কৃষকদের দাবিগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ওই এলাকায় দ্রুত সেতু নির্মাণ ও নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এনআই/আরএন