কার্যাদেশ পাওয়ার দেড় বছরেও ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ‘ইসলামিয়া বাজার-ঘাটঘর-বকশিবাজার’ সড়কের সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় তিন উপজেলার মানুষের যাতায়াতে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
সড়ক প্রশস্তকরণে জটিলতা, দুই পাশের বনায়ন অপসারণে বিলম্ব এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিকে কাজের দীর্ঘসূত্রিতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ঠিকাদার। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হলে কার্যাদেশ বাতিল করা হবে।
ফুলগাজী উপজেলার ‘আমজাদ হাট-ইসলামিয়া বাজার-ঘাটঘর-বকশিবাজার’ সড়কটি আমজাদ হাট ইউনিয়ন, জি এম হাট ইউনিয়ন ও দরবারপুর ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক। পাশাপাশি এটি ছাগলনাইয়া ও পরশুরাম উপজেলার সঙ্গেও সংযুক্ত। প্রায় ৩০টি গ্রামের হাজারো মানুষের চলাচলের একমাত্র পথ এই সড়ক।
উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় সড়কটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনগুরুত্ব বিবেচনায় ফুলগাজী উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ সড়ক সংস্কারের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫.১১ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এলাহি এন্টারপ্রাইজকে। তবে বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে দেড় বছরেও কাজ শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এতে ৩০ গ্রামের হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যানবাহনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় মানুষকে বিকল্প পথে ঘুরে উপজেলা বা জেলা সদরে যেতে হচ্ছে, এতে সময় ও অর্থ—উভয়েরই অপচয় হচ্ছে।
উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ জানায়, দেড় বছরে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। কাজের ধীরগতির কারণে ঠিকাদারকে একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল ২৮ দিনের সময়সীমা দিয়ে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কাজ সন্তোষজনকভাবে শুরু ও অগ্রগতি না হলে কার্যাদেশ বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কটির দুই পাশে মাটি ভরাট করে কিছু অংশ প্রশস্ত করা হয়েছে এবং অনেক গাছ কাটা হয়েছে। ৫.১১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাঁচটি ইউ-ড্রেন কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ভূমি জটিলতার কারণে আরও একটি ইউ-ড্রেন কালভার্ট নির্মাণ করা যায়নি।
আমজাদ হাট এলাকার বাসিন্দা মোতাহার হোসেন বলেন, “বর্তমানে এই সড়ক দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত কষ্টকর। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় হাঁটাচলাই কঠিন হয়ে পড়ে। অসুস্থ রোগী বা জরুরি প্রয়োজনে চলাচল প্রায় অসম্ভব।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ঝন্টু মজুমদার বলেন, “উপজেলা ও জেলা শহর থেকে মালামাল আনার একমাত্র মাধ্যম এই সড়ক। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে এখন সরাসরি মালামাল আনা যায় না। ছাগলনাইয়া হয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে আসতে হয়, এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়।”
স্থানীয় বাসিন্দা সাজেদুর রহমান রিয়াজ বলেন, “গর্তে ভরা এই সড়ক দিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কষ্টে চলাচল করছি। বহুদিন ধরে সংস্কারের কথা শুনছি, কিন্তু কাজের তেমন অগ্রগতি দেখছি না।”
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলাহি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কাজী ইয়াকুব আলী বলেন, “আমরা শুরুতেই সাইট বুঝে নিই। কার্যাদেশে সড়কটি ২০ ফুট প্রশস্ত করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক অংশ ৮ ফুটের মতো সরু ছিল। সড়কের দুই পাশে গাছ ও ফসল থাকায় ভূমি মালিকদের ফসল কাটার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। এছাড়া বন বিভাগ ও জেলা পরিষদের গাছ অপসারণ প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর সময় লেগেছে। পরে মাটির কাজ শেষ হলে বালুর প্রয়োজন হয়, কিন্তু ফেনীতে বালু উত্তোলনের অনুমতি না থাকায় সমস্যা হয়। আমরা চট্টগ্রামের মিরসরাই ও কুমিল্লার দাউদকান্দিতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানেও বালু সংকট ছিল। তবে আমরা সম্প্রতি আবার কাজ শুরু করেছি।”
ফুলগাজী উপজেলা প্রকৌশলী সৈয়দ আসিফ মুহাম্মদ বলেন, “২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সাইট হস্তান্তর করা হয়। ঠিকাদার আংশিকভাবে মাটির কাজ ও পাঁচটি ইউ-ড্রেন কালভার্ট নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। তবে সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। কাজের ধীরগতির কারণে তাকে একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ৬ এপ্রিল ২৮ দিনের সময়সীমা দিয়ে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে কার্যাদেশ বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।”
এটি/আরএন