আমি রাজনীতি করি না। কোনো দিন কোথাও কোন পদ-পদবীর আশাও নাই। তবে আমার প্রাণপ্রিয় দেশকে ভালবাসি। যারা আমাকে এই দেশ দিয়েছে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ অসম্মান করুক আমি সেটা কখনোই মেনে নিতে পারি না। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের শাসনামলকে ঘিরে দেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে- যেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষক সমাজের মতো রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিগুলোও অপমান ও অবহেলার শিকার হয়েছে। এই সময়টিকে অনেকেই জাতির জন্য এক দুঃখজনক ও কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। অনেক যুব সম্প্রদায়কে বিপথে পরিচালনা করেছেন তিনি যারা এ দেশকে ভালো কিছু দেবার স্বপ্ন দেখত।
মানুষ একসময় আশাবাদী ছিল- ভেবেছিল পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অনেকের সেই আশা ভেঙে দিয়েছে। ভয়ের এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে মানুষ সত্য কথা বলতেও সংকোচ বোধ করেছে। কোথাও প্রতিবাদ করলে ‘ট্যাগ’ লাগানো, হেনস্তা, এমনকি সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এখন নির্বাচিত সরকার এসেছে। নিশ্চয় মানুষ মন খুলে কথা বলতে পারবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- শিক্ষকদের মতো সম্মানিত পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে অপমান, হয়রানি এবং প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ রাজনীতি করা কোনো অপরাধ নয়- এটি প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। যদি কেউ রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করে, তার জন্য তাকে অপমান বা নিপীড়নের শিকার হতে হবে কেন- এই প্রশ্ন এখন অনেকের মনে।
আরও বেদনাদায়ক হলো, দেশের গর্ব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানিত হওয়ার ঘটনাগুলো। এটি শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়, বরং আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস ও জাতীয় মর্যাদার ওপর আঘাত। কোনো অপরাধ থাকলে তার বিচার আইন অনুযায়ী হওয়া উচিত- জনতার হাতে বিচার নয়।
এখনও তরুণ প্রজন্মকে ঘিরেও মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেকেই দেশ ভালো কিভাবে থাকবে, সেটা নিয়ে চিন্তা করছে এবং সেই পথে হাঁটছে। প্রাথমিক সামান্য পয়সার জন্য দেশকে বিকিয়ে দিতে তারা কখনোই আসবেনা। এখনো দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে আছে- এটাই আশার জায়গা। তবে কিছু অংশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে, যারা ইতিবাচক রাষ্ট্রগঠনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। তারা এখনো বুঝতে পারছে না যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তারা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নিজেদের জীবনকে তারা আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আপনারা যাচাই করে দেখুন। আমাদের ভুল আমাদেরকে ধ্বংসের পথে যেন না নিয়ে যায় সে ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি না করে, সিন্ডিকেট তৈরি করে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির কৃত্রিম মূল্য বৃদ্ধি না করে এদেশ কি বাঁচানোর জন্য দেশবাসীর কাছে আমার অনুরোধ। এমনিতেই ইরান, আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধ আমাদের তেল সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশে আশি ভাগ জ্বালানি আমদানি হয়। সেই জ্বালানি আমদানিতে আমেরিকান সরকার বাধা সৃষ্টি করেছে।
তবে চায়নার জাহাজগুলো তারা ছেড়ে দিচ্ছে কারণ চায়নার সাথে তারা যুদ্ধে যেতে চায় না। আমাদের মত স্বল্পআয়ের দেশগুলো জ্বালানি সংকটে কতটা বিপদগ্রস্ত হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে আমেরিকা অথবা ইসরায়েলের কোনো মাথা ব্যথা নাই। খুব অল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের দেশ হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। তেল-গ্যাসের মূল্য অস্বাভাবিক পরিমাণ বেড়ে গেছে। এর কারণে গ্রাম থেকে কৃষি জাতক ফসল শহরে আসতে প্রায় বৃদ্ধির কারণে বাজার মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের কল কারখানা বিদ্যুৎ তৈরি সকল ক্ষেত্রে ব্যাহত হচ্ছে একটা সময় ধীরে ধীরে ইন্ডাস্ট্রিগুলো বন্ধের পথে যে যাবে। এমতাবস্থায় আমাদের সকল দল মত নির্বিশেষে একজোট হয়ে দেশের অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থা সামাল দিতে যৌথ ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
বর্তমানে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ একটাই- সচেতন, মূল্যবোধসম্পন্ন তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষা এবং সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
রেজিম পরিবর্তনের পর বাস্তবতা সামাল দেওয়া খুব জটিল কাজ- কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা থাকলে দেশকে দ্রুত স্থিতিশীল করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছু অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ নিলে অর্থনীতি ভেঙে পড়া ঠেকানো যায় এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়।
বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে জরুরী বিষয় হলো-
১. ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। প্রথম ধাক্কাটা আসে মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট ও রাজস্ব ঘাটতিতে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর ভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি সাময়িক ভাবে সীমিত করা যেতে পারে। লক্ষ্য: টাকার মান ধরে রাখা এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
২. দ্রুত অবকাঠামো পুনর্গঠন: যুদ্ধের ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদ্যুৎ তৈরি করে সবাইকে সরবরাহ করা ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু রাখতে সহায়তা করা। শিল্প এলাকা (বিশেষ করে বন্ধ গার্মেন্টস সমূহ) দ্রুত সচল করা। বন্দর কার্যক্রম (চট্টগ্রাম/মোংলা) স্বাভাবিক রাখা এবং সেখানে জনগণের হয়রানি কমানো। অর্থনীতি চালু রাখতে “লজিস্টিক লাইফলাইন” সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
৩. কর্মসংস্থান ও শিল্প সুরক্ষা: বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে Ready-Made Garments industry-এর উপর। গার্মেন্টস, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে প্রণোদনা দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য soft loan /পুনর্বাসন তহবিল প্রদান। দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য “cash-for-work” প্রোগ্রাম চালু করা।
৪. খাদ্য ও সরবরাহ নিরাপত্তা: যুদ্ধের পর খাদ্য সংকট বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও বীজ/সার সহায়তা করা। খাদ্য মজুদ বাড়ানো। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা না থাকলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। সেজন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রেশনিং বা ওএমএস শক্তিশালী করা।
৫. মানবিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা: আহত, বাস্তুচ্যুত, হতদরিদ্র মানুষদের পুনর্বাসন। স্বাস্থ্যসেবা ও ট্রমা কেয়ার। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (ভাতা, খাদ্য সহায়তা) বাড়ানো।
৬. আইনের শাসন ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা: যুদ্ধের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “law & order” আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে দেওয়া। লুটপাট, দখল ও সহিংসতা কঠোর ভাবে দমন। দ্রুত বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৭. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ আনা: International Monetary Fund ও World Bank এর সহায়তা নেওয়া। উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জরুরি তহবিল গঠন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
৮. সুশাসন ও স্বচ্ছতার জন্য কঠোর হস্তে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। ত্রাণ ও পুনর্গঠন কাজে স্বচ্ছতা আনয়ন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ও সংলাপের আয়োজন কারণ আস্থা ছাড়া অর্থনীতি দাঁড়ায় না।
৯. তরুণ ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করা। তরুণদের পুনর্গঠন কাজে যুক্ত করা। স্বেচ্ছাসেবী ও এনজিওদের ভূমিকা বাড়ানো এবং সে ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ করা। সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতা পুনর্গঠন।
রেজিম চেঞ্জ পরবর্তী বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জিনিস: (১) অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, (২) আইন-শৃঙ্খলা, (৩) জনগণের আস্থা। এই তিনটি ঠিক রাখতে পারলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে এবং বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব।
আমি বিশ্বাস করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের দেশের এই সংকট কাটিয়ে একটি সম্মানজনক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আসুন আমরা একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করি এবং দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।
লেখিকা: নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক।
এমএ