সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পূর্ণ হলেও এখনও দোষীদের বিচার কার্য শেষ হয়নি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাননি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সহস্রাধিক লোকের প্রাণহানির পাশাপাশি আড়াই হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী আহত হন।
দিবসটি উপলক্ষে শুক্রবার সকালে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আহত শ্রমিক, নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন। এর আগে সকাল থেকেই বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন আহত শ্রমিক ও নিহত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা। এসময় তারা সরকারের কাছে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ফাঁসির দাবি জানান।
সাভার বাসস্ট্যান্ডের রানা প্লাজা ধসের ঘটনা বিশ্ববাসীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ২০১৩ সালের এই দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রমিক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। এ দুর্ঘটনায় বেঁচে থাকা আহত শ্রমিকরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর্থিকভাবেও ভালো নেই ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা।
ধসে পড়া বহুতল ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় একটি ব্যাংক, ইলেকট্রনিক, কম্পিউটার, প্রসাধনী সামগ্রী ও পোশাকের দোকান ছিল। তৃতীয় তলা থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত ছিল বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানা। নিউ ওয়েভ বটমস, নিউ ওয়েভ স্টাইল, প্যান্টম অ্যাপারেলস, প্যান্টম টেক ও ইথারটেক্স লিমিটেডসহ পাঁচটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতেন কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক নিহত হন এবং আহত অবস্থায় ২ হাজার ৪৩৮ জনকে উদ্ধার করা হয়।
দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের কেউ কেউ ছোট পরিসরে বিভিন্ন ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। অনেকেই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারিয়ে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে বেকার জীবনযাপন করছেন। রানা প্লাজার জায়গা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আহত ও নিহত শ্রমিক এবং তাদের পরিবারকে পুনর্বাসন, আহতদের সু-চিকিৎসা, সোহেল রানাসহ দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত, ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা, রানা প্লাজার সামনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শ্রমিকদের এক জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানান বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় এখনও আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়নি। আহত শ্রমিকরা চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কনভেনশন ১২১ অনুসারে নিহত ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। ওই ঘটনায় জড়িতদের বিচার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রানা প্লাজা ও তাজরীন কারখানার মতো বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রমিক হত্যার ঘটনার পরও এসব মামলার অধিকাংশ আসামি বর্তমানে জামিনে মুক্ত। শুধু ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া অন্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার এখনো দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তুহিন চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট দিনে আমরা এখানে আসি, আবার দিন শেষে বাড়ি ফিরে যাই। সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু রানা প্লাজার শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। এত মানুষ মারা গেল, অনেকেই আহত হলো, কিন্তু তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।
বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অরবিন্দু ব্যাপারী বিন্দু বলেন, রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছরে দোষীদের বিচার আমরা দেখতে পাইনি। আগের সরকার বিচারের আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু বিচার হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি—ন্যায্য দাবিগুলো যেন পূরণ করা হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল-গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশ, গার্মেন্টস শ্রমিক টেক্সটাইল ফেডারেশন, ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টার, গ্রামীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনসহ নানা শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ নিহতদের স্বজন ও আহত শ্রমিকেরা অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এদিকে, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। ২০১৬ সালে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। শুরু হলেও একের পর এক আইনি জটিলতা, উচ্চ আদালতে আবেদন এবং সাক্ষ্যগ্রহণে ধীরগতির কারণে মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রয়েছে।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষী করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১৪৫ জন। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত করতে বারবার নির্দেশ দেওয়া হলেও পুলিশ তাদের হাজির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ছয় মাসের মধ্যে মামলা শেষ করার নির্দেশ দিলেও তাতে তেমন অগ্রগতি হয়নি। ফলে বিচার প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি সোহেল রানার পক্ষের আইনজীবীরা তাকে এখনো নির্দোষ দাবি করছেন এবং বলছেন, তাকে অন্যায়ভাবে আটক রাখা হয়েছে। এমন নৃশংস ঘটনার বিচার নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। আগামী ৩০ এপ্রিল এ মামলায় আবার সাক্ষ্যগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষী হাজির করতে পারলে মামলাটি নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে যাবে।
ওএফ/আরএন