‘আমার বাপের একশ বিঘা জমি ছিল, এখন আমাদের ছয় ভাইয়ের ছয় বিঘা জমি আছে। এই এক বিঘা জমি দিয়েই আমাদের সংসার চলে, সন্তান মানুষ করতে হয়। ধানের থোর বের হয়েছে—এই ক্ষেত নদীতে গেলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।’ একটানে কথাগুলো বলছিলেন জুলহাস সরদার।
রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায় অসময়ে আবারও নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে ধানের জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে বেথুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কবরস্থান, ঈদগাহ এবং কয়েকশ বাড়িঘর।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে পদ্মা নদীর ভাঙনকবলিত স্থানের এ চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকার ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে পদ্মা নদীর পাড়ের প্রায় ৫০ ফুট এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে হাবিজল সরদারের ধানের ক্ষেত বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় তিন কাঠা জমি ধানসহ নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে পেঁয়াজক্ষেতসহ অন্যান্য আবাদি জমি।
প্রতিবছর ভাঙন শুরু হলে স্থানীয়দের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। এরপর সরকারি জিওব্যাগ ফেলা হয়, কিন্তু ততক্ষণে ৫০-৬০ বিঘা জমি পদ্মার বুকে চলে যায়। এভাবেই মানচিত্র থেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকা। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হয়, নতুন করে শুরু হয় আশার বাণী; কিন্তু ধীরে ধীরে অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
এদিকে দৌলতদিয়া ঘাট আধুনিকায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া প্রান্তে ৬ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী নদীতীর প্রতিরক্ষা নির্মাণের কথা থাকলেও প্রায় সাত বছরেও প্রকল্পটির অগ্রগতি দেখা যায়নি। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও দেবগ্রাম ইউনিয়নে ভাঙনরোধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গত কয়েক দিনের ভাঙনে প্রায় ১০ বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল, কবরস্থান, ঈদগাহসহ কয়েকশ বাড়িঘর। ভাঙন দেখতে স্থানীয়রা নদীর পাড়ে ভিড় জমাচ্ছেন। আতঙ্কে শত শত পরিবার নদীর পাড়েই দিন কাটাচ্ছে। জমিতে লাগানো পাট কাঁচা অবস্থায় কেটে নিচ্ছেন কৃষকরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজসেবক জামাল মুন্সি বলেন, এখানে অসময়ে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এতে কৃষিজমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। আমাদের দাবি, আপাতত জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন রোধ করতে হবে। এখানে চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চারটি মসজিদ রয়েছে। ভাঙন বন্ধ করা না গেলে সবকিছু ভেঙে যাবে। গত ২৫ বছর ধরে এখানে নদী ভাঙছে।
একই এলাকার আবদুল হামিদ মৃধা, মজিদ ব্যাপারীসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে নদীভাঙন হচ্ছে। কিন্তু ভাঙন ঠেকাতে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। যে-ই এমপি হন, তিনি আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। ভাঙনে এই এলাকার শত শত বিঘা কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় নতুন করে আবার ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি, স্কুল, মসজিদ ও বাজার। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, অসময়ে নদীভাঙনে ফসলের ক্ষতি হবে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে নিয়ে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান বলেন, বিষয়টি শুনেছি। ইতিমধ্যে একটি টিম সেখানে পাঠানো হয়েছে। তারা পরিদর্শন শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ভাঙন এলাকার আশপাশে স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসার মতো স্থাপনা থাকলে জরুরি ভিত্তিতে সেখানে কাজ করা হয়।
এসআই/আরএন