বরগুনার পাথরঘাটায় নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নীল রতন সরকার।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে বরগুনা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান তিনি। চিঠিতে নিজের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে উল্লেখ করে কর্মস্থল ত্যাগের কথা জানান ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
জানা গেছে, পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ও কাপড় ধোয়ার কাজের ঠিকাদারি কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন খাতের ঠিকাদারি নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নতুন নয়। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রধান কর্মকর্তার অনুপস্থিতি হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার রাত প্রায় ১১টার দিকে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি ডা. নীল রতন সরকারের সরকারি কোয়ার্টারের দ্বিতীয় তলার কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। পরে ভোরে সরকারি গাড়িতে তাকে বড়ইতলা ফেরিঘাটে পৌঁছে দেওয়া হয়।
হাসপাতালের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি পাথরঘাটা উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক খায়রুল ইসলাম শরিফ হাসপাতালে গিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্তত দুজন রোগীও এ ধরনের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে খায়রুল ইসলাম শরিফ বলেন, তিনি এ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন এবং ঘটনার দিন হাসপাতাল এলাকায় যাননি।
পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নীল রতন সরকার বলেন, “চাকরি নয়, সেবা দিতে এসেছিলাম। যেখানে আমার জীবনের নিরাপত্তা নেই, সেখানে জনগণ কীভাবে সেবা প্রত্যাশা করবে? এই পরিস্থিতিতে কর্মস্থলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানান, স্যানিটারি ও কাপড় পরিষ্কারসহ কয়েকটি খাতের ঠিকাদারি নিয়ে একটি প্রভাবশালী পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। ঘটনার আগের দিন বিষয়টি পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সংক্ষিপ্ত চিঠির মাধ্যমে কর্মস্থল ত্যাগের বিষয়টি জানিয়েছেন। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে এবং পুরো ঘটনার ওপর প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে।
জেলা পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা জানান, সরকারি কোয়ার্টারে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে হাসপাতাল এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মুস্তাফিজুর রহমান মঙ্গলবার সিভিল সার্জন কার্যালয় পরিদর্শনকালে পাথরঘাটার ঘটনাটি তাকে অবহিত করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে লিখিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জানানো হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পুনরায় দায়িত্বে ফিরবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অনুপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে হাসপাতালের চিকিৎসা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা।
আইএইচ/এসআর