সকালে বাজারে গিয়ে রিকশাচালক রহিম যখন এক কেজি চাল, আধা কেজি ডাল আর সামান্য সবজির দাম জিজ্ঞেস করেন, তখন তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। কিছু দিন আগেও যে টাকায় তিন বেলার খাবার জুটতো, আজ সেই টাকায় দু'বেলা চালানোই কঠিন।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ছোট চাকরিজীবী কামাল সাহেব হিসাব মিলাতে মিলাতে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র না নিয়েই ফিরে আসেন। বাড়িতে সন্তান অপেক্ষা করছে, তবুও পকেটের সীমাবদ্ধতা তাকে থামিয়ে দেয়। এভাবেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর মূল্যস্ফীতির চাপে প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই হয়ে উঠছে একেকটি বড় ত্যাগের গল্প- যেখানে মানুষের শুধু চাহিদাই নয়, বরং বেঁচে থাকাটাই যেন হয়ে উঠছে প্রধান সংগ্রাম।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা উঠলেই আমরা গর্বের সঙ্গে বলি- প্রবৃদ্ধি হয়েছে, অবকাঠামো এগিয়েছে, রিজার্ভ উঠেছে-নেমেছে, নতুন নতুন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের চকচকে পর্দার আড়ালে যে এক গভীর বাস্তবতা জমাট বেঁধে উঠছে, সেটি আমরা অনেক সময় ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাই। প্রশ্নটি তাই বার বার ফিরে আসে- এই উন্নয়ন কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জীবনকে স্বস্তিদায়ক করতে পেরেছে?
বাজারে ঢুকলেই উত্তরটি মেলে। একজন দিনমজুর, একজন নিম্নবিত্ত শ্রমিক, কিংবা ছোট চাকরিজীবী- এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, সংখ্যার এই উন্নয়ন বাস্তব জীবনে কতটা অনুপস্থিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম শুনে তাদের বিস্মিত, কখনো বা বিব্রত দৃষ্টিই যেন আমাদের সময়ের নির্মম সত্যকে প্রকাশ করে। আয় আর ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে তারা প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। ক্রয় ক্ষমতা যেন ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে- অপ্রকাশিত, অথচ সর্বগ্রাসী এক সংকটের মতো।
মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু সমস্যা তখনই প্রকট হয়, যখন এটি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রায় স্থায়ী হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা আর সাময়িক ওঠানামার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন একটি কাঠামোগত সংকটের রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে। চাল, ডাল, তেল, ডিম, সবজি- প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা প্রতিটি পণ্যই যেন নাগালের বাইরে সরে যাচ্ছে। এছাড়া, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও পরিবহন সেবা থেকে শুরু করে অন্যান্য সমস্যা তো আছেই।
ফলে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও এসেছে নীরব পরিবর্তন। পুষ্টির কথা ভেবে নয়, বরং পকেটের হিসাব মিলিয়ে এখন খাবার বেছে নিতে হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে কম দামের বিকল্প খুঁজতে, কেউ কেউ আবার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। এটি কেবল অর্থনীতির সংকট নয়- এটি মানবিক সংকটের এক গভীর প্রতিফলন। একটি শিশুর প্লেটে যখন প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে না, তখন তার প্রভাব শুধু বর্তমানেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ভবিষ্যতের ওপরও দীর্ঘ ছায়া ফেলে।
একসময় যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ তারাই সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। এই শ্রেণি বাজারকে সচল রাখে, সঞ্চয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগে ভূমিকা রাখে এবং অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- তাদের আয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। ফলে তারা বাধ্য হচ্ছেন সঞ্চয় ভাঙতে, ব্যয় কমাতে, কিংবা ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে।
জীবনযাত্রার এই সংকোচন অনেক সময় বাইরে থেকে চোখে পড়ে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তা মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে। একসময় যে পরিবার বছরে একবার ঘুরতে যেত, এখন তারা সেই স্বপ্ন স্থগিত রাখছে। যে পরিবার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতো, তারা এখন প্রয়োজন না হলে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে চাইছেন না। সন্তানের ভালো শিক্ষার জন্য যে ব্যয় ছিল অগ্রাধিকার, তাতেও এখন হিসাব-নিকাশ ঢুকে গেছে। জীবনের প্রতিটি খাতে এক অদৃশ্য ‘সংযম’ আরোপিত হয়েছে, যা আসলে বাধ্যতামূলক বেঁচে থাকার কৌশল।
এই সংকটের পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ কারণ দায়ী নয়; বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন- এসবের সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়ন, যা আমদানি ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে সব দায় বাইরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং কখনো কখনো সিন্ডিকেটের প্রভাব- এসব কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক সময় সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হয়। এতে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে পণ্য থেকে বঞ্চিত হন এবং বাজারের ওপর আস্থা হারাতে থাকেন।
এই পুরো পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষরা। তাদের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় খাদ্যে। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের জীবনে তার প্রভাব বহুগুনে বেড়ে যায়। অনেকেই এখন দিনে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাচ্ছেন, কেউবা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। এই দৃশ্য কেবল দারিদ্র্যের নয়; এটি একটি সমাজের ভেতরে জমে ওঠা নীরব বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি।
শহুরে জীবনযাত্রাও এখন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন- সব মিলিয়ে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনেকের আয়কে অতিক্রম করছে। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়ে কম খরচের এলাকায় সরে যেতে হচ্ছে, কর্মস্থলের দূরত্ব বাড়াতে হচ্ছে, কিংবা জীবনের অন্য প্রয়োজনীয় খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক এই চাপ মানুষের মানসিক জগতেও গভীর প্রভাব ফেলছে। অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, হতাশা- এসব অনুভূতি ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে বাসা বাঁধছে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন না, তখন তা শুধু আর্থিক সংকট নয়- আত্মসম্মানেরও আঘাত। এর প্রভাব পড়ে পারিবারিক সম্পর্কে, সামাজিক স্থিতিশীলতায়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ প্রবণতাও বাড়িয়ে দেয়।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের পথ সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি সুসমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি, যেখানে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সুষম সমন্বয় থাকবে। কৃষিখাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে। বাজার তদারকি জোরদার করে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা রোধ করতে হবে।
একইসঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন, যাতে নিম্নআয়ের মানুষ অন্তত ন্যূনতম জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা পায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- মজুরি কাঠামোকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। মানুষের আয় না বাড়লে, মূল্যস্ফীতি যতই নিয়ন্ত্রণ করা হোক না কেন, বাস্তব জীবনে তার সুফল পৌঁছাবে না।
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। উন্নয়নের গতি যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, তেমনি সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটও অস্বীকার করা যায় না। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে স্বস্তি আনে; যখন তা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের মুখের হাসিতে প্রতিফলিত হয়। আজকের এই ক্রয় ক্ষমতার সংকট আমাদের সেই মৌলিক সত্যটির কথাই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে- রাষ্ট্রের শক্তি তার মানুষের জীবন মানেই নিহিত।
যদি এই বাস্তবতাকে আমরা গুরুত্ব না দিই, তবে প্রবৃদ্ধির সব অর্জন একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে। তাই এখনই সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, তাদের কষ্ট বোঝার এবং এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার, যেখানে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছায়- কেউ যেন ক্রয় ক্ষমতার বাইরে পড়ে না থাকে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেইলি অবজারভার।
এমএ