ফেনীর সোনাগাজীতে মাসুদ নামে এক ব্যক্তি ইউটিউব দেখে বিকল্প পদ্ধতিতে অকটেন তৈরি বা গ্যাস সিলিন্ডারের প্রেসার বৃদ্ধির অপচেষ্টার মাশুল দিতে হলো প্রাণ দিয়ে। বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়ার চারদিন পর শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন ‘সততা অয়েল মিলস’-এর মালিক নুর আলম মাসুদ (৪৫)।
তার অপর সহকর্মী ওমর ফারুক (কালা খান) এখন বার্ণ ইউনিটে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন।
বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও ফেসবুকে 'ইউটিউব দেখে অকটেন তৈরির চেষ্টা, ফেনীর সোনাগাজীতে বিস্ফোরণে অয়েল মিল মালিকের মৃত্যু' বিভিন্ন মাধ্যমে এভাবে প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন ও বিস্ফোরণ স্থানের আলামতে সেরকম কিছু দেখা যায়নি। সেখানে শুধুই ধ্বংসস্তূপ।
প্রয়োজনীয় গবেষণাগার, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি সহায়তা, যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়াই তিনি আগুন নিয়ে খেলতে শুরু করেছিলেন। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের বিষয়টি হয়তোবা তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। সে থেকে তিনি কিছু একটা উদ্ভাবন করতে চেয়েছিলেন। যেন দেশ ও জনগণের কল্যাণ সাধিত হয়। সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এখন দুটি পরিবারে নিদারুণ হাহাকার আর অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
নিহত নুর আলম মাসুদ সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের ওমর খান পাঠান বাড়ির মৃত খুরশিদ আলমের ছেলে। তিনি সোনাগাজী পৌরসভার নজরুল প্রাইমারি এলাকার নতুন বাড়িতে বসবাস করতেন। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মূলত অপরিপক্কতার মাসুল দিতে হলো মাসুদকে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকেলে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নজরুল প্রাইমারি এলাকায় সততা ওয়েল মিলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এতে গুরুতর দগ্ধ হন নুর আলম মাসুদ ও তার সহকর্মী মো. ওমর ফারুক। এরপর স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। সেখানে চারদিন পর মাসুদের মৃত্যুর হয়।
গতকাল শনিবার রাত ১১ টায় সোনাগাজীর ওমর খান পাঠানবাড়ি জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
অপর দগ্ধ ওমর ফারুক (৪০) টমটম চালক নিহত মাসুদের সহকর্মী ছিলেন। তিনি পার্শ্ববর্তী মানতকি বাড়ির মৃত আব্দুর রশিদের পুত্র। এখনো বার্ণ ইউনিটে মুমূর্ষ অবস্থায় রয়েছেন। তার শরীরও ৫০ ভাগের বেশি দগ্ধ হয়েছে। তার স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে।
নিহত মাসুদের ভাই মোরশেদ আলম রাসেল বলেন, আমার ভাই ছোটকাল থেকেই একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ ছিলেন। তার ভালো উদ্ভাবনী চিন্তা ছিল। সে যেখানে যা দেখতেন তা তৈরি করতে পারতেন। অকটেন তৈরি করার মত প্রযুক্তি বা সাপোর্টিং তার ছিল না। অকটেন তৈরির জন্য যে ক্রুড অয়েল প্রয়োজন তিনি তা কোথা থেকে পাবেন?
তিনি আরো বলেন, আমার ভাই এর গ্যাস সিলিন্ডারেরও ব্যবসা ছিল। সেখানে সিলিন্ডারে যে জ্বালানি ব্যবহার করা হয় তার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য একটা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, তিনি ওখানে একটি ভ্যাসেল বানিয়েছেন, একটি মনিপুল বানিয়েছেন। ভ্যাসেলের ভিতরে কিছু লিকুইড দিয়েছেন, পোড়া মবিল ও ইঞ্জিন অয়েল, এডজাস্ট ফ্যানের হাওয়া ব্যবহার করেছেন। যাতে গ্যাস সিলিন্ডার দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায়। এভাবে তিনি তার সততা অয়েল মিল কারখানায় প্লাস্টিক, ইঞ্জিন অয়েল, হাওয়া এবং আগুন দিয়ে একটি স্টিম বানাতে চেয়েছেন হাই প্রেসারের জন্য। কিন্তু তাতো আর সাকসেস হয় নাই। মৃত্যুর মাধ্যমে তার এই প্রচেষ্টার সমাপ্তি হলো।
বিস্ফোরণের দগ্ধ ওমর ফারুকের ভাই শাহাব উদ্দিন বলেন, সে একজন অটো টমটম চালক। তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে আছে। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার আমাদের। চিকিৎসা করার কোন সমর্থ নেই। সরকার বা বিত্তবান জনগণ যদি আমার ভাইয়ের পাশে দাঁড়ায় তাহলে আমার ভাই প্রাণে রক্ষা পাবেন। আমি সবার নিকট সহায়তা কামনা করছি।
এ ব্যাপারে ফেনী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোঃ গোলাম দস্তগীর বলেন, ইউটিউব দেখে বা ইউটিউবে সব সুবিধা অসুবিধা বা বিপদের আশঙ্কা সবকিছু বলা থাকে না। এজন্য এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হলে যারা অভিজ্ঞ, ভালো জানেন তাদের পরামর্শ নিতে হয়। নিজেরা অনেক পড়াশুনা করতে হয়। সব বিষয়ে জানতে হয়। তারপরেই উদ্ভাবন। আনাড়িভাবে করলে সব কিছুর মাশুল দিতে হয়। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সচেতন হওয়া দরকার।
এমএটিবি/ এসআর