ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
শেরপুরে লোকালয়ে বন্যহাতির তান্ডব
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:১০ এএম
X

বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে শেরপুর জেলার গারো পাহাড়ি এলাকার সীমান্তজুড়ে বন্যহাতি ও মানুষের মাঝে দ্বন্দ্ব এখন চরম আকার ধারণ করেছে। খাবারের সন্ধানে বন্যহাতির দল প্রায় প্রতিদিনই গহীন বন অতিক্রম করে লোকালয়ে ব্যাপক তান্ডব চালাচ্ছে। এই নিয়ে প্রায়ই বন্যহাতি ও মানুষের মাঝে সংঘর্ষ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রায় দীর্ঘ তিন দশক ধরে চলে আসা হাতি-মানুষের এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রতি বছরই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল।
 
বন্যহাতির আক্রমণে যেমন সাধারণ মানুষ পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। তেমনি মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে বিরল প্রজাতির এশিয়া মহাদেশের এসব বন্যহাতি। বন বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বার বার নানা উদ্যোগের আশ্বাস দেওয়া হলেও এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। ফলে চরম উৎকণ্ঠা ও দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর হাজার হাজার মানুষ। বর্তমানে বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির উৎপাত বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। ক্ষুধার্ত বন্যহাতির দল কখনো ফসলের মাঠে আবার কখনো কৃষকের সবজি খেতে হানা দিচ্ছে। কৃষকরা তাদের সোনার ফসল রক্ষা করতে মাঝে মধ্যেই বন্যহাতির সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হচ্ছে। ডাক চিৎকার ও হৈ-হুল্লোড় করে বন্যহাতি তাড়ানোর নিষ্ফল চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনের নামে সোলার ফেন্সিং প্রকল্প বা বেত বাগান তৈরির মতো নানা প্রকল্প দেখিয়ে বন বিভাগের এক শ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা ও দলীয় ঠিকাদারের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। দুর্নীতির এই বলয়ে পড়ে ভেস্তে গেছে জননিরাপত্তার নামে সকল উদ্যোগ।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ, অবাধে বন নিধন ও পাহাড় দখলের কারণে গহীন অরণ্যে হাতির খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে ক্ষুধার্ত হাতির পাল লোকালয়ে নেমে এসে শুরু করে অভাবনীয় তান্ডব। জানমালের ক্ষতি এখন এই জনপদে প্রায় নিত্য দিনের ঘটনা। বিগত কয়েক দশকে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্ত এলাকায় বন্যহাতির আক্রমণে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আরো অনেক হতভাগা মানুষ।

এদিকে, পাহাড়ি এলাকার ফসল রক্ষায় মরিয়া হয়ে কৃষকদের দেওয়া জিআই তারের বৈদ্যুতিক মরণ ফাঁদে প্রাণ হারিয়েছে বেশ কয়েকটি বন্যহাতি। যা জীব বৈচিত্রের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ। পাহাড়ের গ্রামগুলোতে এখন সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় হাতির আতঙ্ক। কখন যে তান্ডব শুরু করে ফসল মাড়িয়ে কিংবা ঘরবাড়ি ভেঙে গুড়িয়ে দেয়।

আক্রান্ত এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে মশাল জ্বালিয়ে, টিন পিটিয়ে কিংবা উচ্চশব্দে পটকা ফাটিয়েও আর দমিয়ে রাখতে পারছেন না ক্ষুধার্ত হাতির পালকে। ফলে প্রতিটি সীমান্তবর্তী মানুষের রাত কাটে নির্ঘুম উদ্বেগে। অনেক ক্ষেত্রে হাতির পাল মাটির ঘরের দেয়াল ভেঙে ধান-চাল খেয়ে সাবাড় করার পাশাপাশি ঘুমন্ত মানুষকেও আক্রমণ করছে। আর অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন অসহায় মানুষ।

বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হাতি-মানুষের এই দ্বন্দ্ব নিরসনে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে বন বিভাগের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা প্রদান করা অব্যাহত রয়েছে। তবে বন উজাড় ও হাতির খাদ্যাভাবের কারণে তারা বারবার লোকালয়ে চলে আসছে। যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। যার স্থায়ী সমাধানে আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছি।’

ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা আরো জানান, প্রশাসনের এমন গতানুগতিক আশ্বাসে আর আস্থা রাখতে পারছেন না। তাদের দাবী, সঠিক পরিকল্পনা ও সৎ তদারকি ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

এদিকে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের বিষয়ে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সীমান্তবর্তী মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। বিগত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই জনপদের মানুষ বন্যহাতির সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রথম বক্তব্যদানকালেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য জোরালো দাবী জানিয়ে বক্তব্য রেখেছি। বক্তব্যে আমি একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির প্রস্তাব দিয়েছি। যাতে করে বন্যহাতির স্থায়ী অভয়াশ্রম নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে হাতির সনাতন করিডোরগুলো পুনরুদ্ধার করা না গেলে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। আমি হাতির জন্য পাহাড়ে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বনায়নের পরিকল্পনা হাতে নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি। আশা করি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ হবে।’

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের মতে, গারো পাহাড়ি সীমান্ত থেকে আসা হাতিগুলো মূলত খাবারের সন্ধানেই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। আগে পাহাড়ে প্রচুর পরিমাণে কলাগাছ, বাঁশসহ প্রাকৃতিক বন থাকলেও বন বিভাগের অদূরদর্শিতা এবং এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বনদস্যুদের যোগসাজশে এখন সেখানে বাণিজ্যিক বাগান ও মানুষের বসতি গড়ে ওঠায় হাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু এলাকায় সোলার ফেন্সিং নির্মাণ করা হলেও তা নিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দলীয় ঠিকাদারের যোগসাজশে লুটপাট ও অবহেলার কারণে তা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সীমান্তবাসী এখন আর মৌখিক আশ্বাস নয়। বরং স্থায়ীভাবে জানমাল ও ফসলের নিরাপত্তা চায়। দ্রুত কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়া না গারো পাহাড়ি জনপদ অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। একই সাথে বন বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবীও জানিয়েছেন তারা।

এমএস/এসআর



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝