রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ। বাঙালির প্রাণের বৈশাখী মেলাকে ঘিরে গাইবান্ধার বিভিন্ন পালপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের মধ্যে এখন কর্মচাঞ্চল্যের এক ভিন্ন দৃশ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাটির তৈরি নানা পণ্য প্রস্তুতে তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঐতিহ্যবাহী মাটির সামগ্রী তৈরিতে দিন-রাত পরিশ্রম করলেও আধুনিক পণ্যের দাপটে প্রায় দুই শতাব্দীর এই শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে বৈশাখী মেলাই এখন তাদের প্রধান ভরসা।
সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলার সাহাপাড়া, নারায়ণপুর ও রসুলপুর এলাকায় দেখা যায়, মৃৎশিল্পীরা কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ তৈরি করছেন হাঁড়ি-পাতিল, দইয়ের পাতিল, পিঠার খোলা, বাটি, মাছ ধোয়ার পাত্র, মাটির ব্যাংক ও টেপা পুতুল। আবার কেউ রোদে শুকাচ্ছেন, কেউ বা আগুনে পুড়িয়ে এসব পণ্যে চূড়ান্ত রূপ দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাইবান্ধা জেলার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে সারা বছর কাজের সুযোগ না থাকায় তারা বৈশাখী মেলাকেই কেন্দ্র করে কিছুটা আয়-রোজগারের আশা করেন।
সাহাপাড়া এলাকার নারায়ণ বাবু পাল বলেন, “বাবার হাত ধরেই এ পেশায় এসেছি। আগে মাটির চাকে কাজ করতাম, যা ছিল খুবই পরিশ্রমের। এখন কিছুটা মেশিনের ব্যবহার শিখেছি। তবুও আগের মতো চাহিদা নেই।”
নারায়ণপুরের মৃৎশিল্পী মাধবী রানী ও স্নিগ্ধা রানীসহ আরও অনেকে বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে মাটির কাজ শিখেছি। বিয়ের পরও এই কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এখন আর আগের মতো বিক্রি হয় না। প্লাস্টিকের জিনিস আসায় মাটির কাজের কদর অনেক কমে গেছে।”
রসুলপুর এলাকার যতীন্দ্র নাথ বলেন, “এটি আমাদের বাপ-দাদার পেশা। কিন্তু এখন এই কাজ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। খরচ বেড়েছে, লাভ কমেছে। তাই নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চায় না।”
পালপাড়ার সুচিত্রা পাল বলেন, “প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে মাটির ব্যাংক ও খেলনা বানাচ্ছি। আগে অনেক বিক্রি হতো, এখন শুধু বৈশাখী মেলা বা বান্নী মেলার সময় কিছুটা বিক্রি হয়।”
স্কুল শিক্ষক মোশাররফ মণ্ডল জানান, আগে এই এলাকায় অনেক মানুষ মাটির কাজ করতেন। এখন তরুণরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। বৈশাখী মেলা ঘিরে সাময়িক চাহিদা বাড়লেও সারা বছরের চিত্র হতাশাজনক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লোকমান হোসেন জানান, “যেহেতু এটি তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা, তাই এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে তারা সহযোগিতা চাইলে অবশ্যই তাদের সহায়তা করা হবে।”
টিএইচ/আরএন