লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ান জমি থেকে মাটি বিক্রির মহোৎসব চলছে। এসব জমি থেকে একটি প্রভাবশালী মহল একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন ইটভাটায় মাটি বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রায় কয়েক কোটি টাকা। মাটি বিক্রি চক্রের সদস্যরা বলেন, প্রশাসন, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করেই চলছে তাদের এ অবৈধ মাটি বিক্রির কর্মযজ্ঞ।
এদিকে, এই মাটি বিক্রি নিয়ে চরাঞ্চলে একাধিক গ্রুপের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুড়ে দিচ্ছে। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের এই প্রতিযোগিতায় চরাঞ্চলে যে কোনও সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটতে পারে। ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের টুমচর গ্রামের আযাদ মার্কেট সংলগ্ন আলমগীর সমাজ নামক এলাকায় ভূলুয়া নদীর পাশে প্রায় ২শ ২৫ শতাংশ জমি ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকার বরাদ্দ করেছেন। ওই জমিগুলোতে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ভূমিহীনরা সয়াবিন, বাদাম ও ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
গত ৩ মাস ধরে স্থানীয় চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আজাদ উদ্দীন, ইসমাইল ব্যাপারী, উপজেলা ছাত্রদল নেতা মোঃ ফরান, বিএনপি কর্মী হেলাল ব্যাপারী, আলাউদ্দীন ও আলমগীর মেস্তুরীসহ একটি প্রভাবশালী চক্র জমি দখল করে মাটি বিক্রি করছেন। উর্বর এই কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করে জমিগুলোকে পুকুর বানিয়ে ফেলেছেন। এতে একদিকে ভুলুয়া নদীর ভাঙন, অন্যদিকে বিশাল চরের মধ্যে বড় বড় পুকুর তৈরির কারণে বর্ষা মৌসুমে ওই এলাকার অন্তত ৫০টি বসতবাড়ি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়রা রয়েছেন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায়।
এলাকাবাসী জানান, ওই প্রভাবশালী একাধিক চক্র ৩ মাস ধরে প্রথমে দিনের বেলায় মাটি বিক্রি শুরু করলে উপজেলা প্রশাসনের বাধার মুখে পড়ে। পরে তারা রাতের বেলায় অন্তত ২০টি ভেকু মেশিন ব্যবহার করে প্রায় ২৫টি ট্রাক্টর টলি দিয়ে মাটিগুলো বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছেন। প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় কোনও কৃষক মুখ খোলার সাহসও পাচ্ছে না।
স্থানীয় আলমগীর সমাজের মসজিদ কমিটির সভাপতি মোঃ আলমগীর মাটি কাটায় বাধা দিলে চক্রটি তাকে ২০ হাজার টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করেছেন। বিষয়টি আলমগীর নিজেই এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন।
এবিষয়ে মুঠোফোনে হেলাল ব্যাপারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “আমরা তাদের জমি থেকে মাটি কাটছি। এই জমি খাস কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষের জমি নদীতে ভেঙে পরে চর হয়ে গেছে, তাই খাস হয়েছে। আমরা ৩ মাস ধরে মাটি কাটছি। হঠাৎ আপনাদের কে খবর দিলো? আমরা প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করেই মাটি কাটছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক বলেন, “এ এলাকায় প্রচুর সয়াবিন, বাদাম ও ধান চাষ হয়। সরকারের খাস জমি দখল করে মাটি কেটে বিক্রি করছে চক্রটি। বর্তমানে ওই জমিগুলোকে বড় বড় মাছের ঘের বানিয়ে ফেলেছে। সরকার জমিগুলো অসহায় গরিব মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ করেছে। কিন্তু প্রভাবশালী চক্র সে জমিগুলো থেকে মাটি বিক্রি করে প্রায় কোটি টাকার উপরে হাতিয়ে নিচ্ছে।”
চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোঃ নাসির উদ্দিন বলেন, “কয়েকবার আমরা পরিষদের পক্ষ থেকে বাধা দিয়েছি। উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ভূমি অফিসকে অবহিত করেও জমিগুলো রক্ষা করতে পারিনি। তারা কারো কথাও শুনছে না। রাতের বেলায় মাটি কাটার মহোৎসব চলে ওই এলাকায়। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাতেও ২০টি ভেকু মেশিন ব্যবহার করে প্রায় ২৪টি ট্রাক্টর টলি মাটি কেটে নেয়।”
চরগাজী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি কর্মকর্তা (তহসিলদার) মোবারক হোসেন বলেন, তিনি সরেজমিনে গিয়ে বাধা প্রদান করলেও চক্রটি তা মানছে না। তারা মাটি কেটে জমিগুলোকে পুকুর বানিয়ে ফেলছে।
রামগতি থানার ওসি লিটন দেওয়ান বলেন, “ওই জায়গা থেকে পুলিশ পাঠিয়ে একবার একজনকে আটক করেছি। বিষয়টি ইউএনও স্যারের কাছে জানান।”
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা বলেন, “অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন ওই এলাকায় মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে। অবৈধভাবে মাটি কাটা চক্রের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আরএম/আরএন