টানা বৃষ্টিতে একের পর এক হাওরের বোরো ফসল পানিতে ডুবে যাওয়ায় সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে কৃষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে হাহাকার। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার ১২ উপজেলায় ১,১৮৯ হেক্টর জমি ডুবে গেছে। তবে কৃষকদের মতে, বাস্তবে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন থেকে পানি নিষ্কাশন বা হাওর রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার রংচী গ্রামের কৃষক আনোয়ার মিয়া বলেন, “আমার প্রায় ২৫ কেয়ার (এক কেয়ার সমান ২৮ শতক) জমি বুকসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। যেগুলো এখনও ভাসমান রয়েছে, সেগুলোও বৃষ্টি হলে তলিয়ে যাবে।”
তিনি আরও জানান, ঋণ করে জমি চাষাবাদ করেছেন। এত কষ্টের ফসল নষ্ট হলে সারাবছর পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো—এই চিন্তায় দিন কাটছে। গরু-বাছুরের খড় কোথা থেকে আসবে—এই ভাবনাও মাথায় ঘুরছে। দুয়েক দিনের মধ্যে হাওর থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হলে ধান রক্ষা পেতে পারে।
থেমে থেমে বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন হাওরে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে কৃষকের কাঁচা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফসল রক্ষা করতে গিয়ে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করলে প্রশাসনের সঙ্গে কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা ও বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। ঝুঁকি এড়াতে জেলা প্রশাসন কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কয়েকটি বাঁধে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন মধ্যনগর উপজেলার বাইনছাপড়া হাওরে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমির সবুজ বোরো ধান পানির নিচে ডুবে আছে। কোথাও কোমর সমান, কোথাও তার চেয়েও বেশি জলাবদ্ধতা। স্থানীয়দের মতে, এই একটি এলাকায় অন্তত ৪–৫টি গ্রামের শতাধিক হেক্টর জমির কাঁচা বোরো ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। গত ৩–৪ দিন ধরে কৃষকেরা সম্মিলিত উদ্যোগে সেলু মেশিন দিয়ে সেচের মাধ্যমে হাওরের পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হাওরপাড়ের চামরদানি গ্রামের কৃষক বাদল সরকার বলেন, “এক বিঘা জমি করতে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হয়। কত কষ্ট আর স্বপ্ন নিয়ে চাষাবাদ করেছি! এখন আমার মতো হাজারো কৃষকের মাথায় হাত। সারা বছর কীভাবে সংসার চলবে জানি না। পানি যদি অপসারণ করা না যায়, শতাধিক হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে যাবে।”
এ অবস্থা শুধু মধ্যনগর উপজেলায় নয়। সুনামগঞ্জ সদর, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ ও দিরাই-শাল্লা উপজেলা থেকেও কৃষক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। জেলার সব হাওরের নিচু এলাকায় কমবেশি জলাবদ্ধতায় ফসল ডুবছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষক নিজেই বাঁধ কেটে পানি অপসারণের চেষ্টা করছেন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফারুক আহমদ বলেন, “কৃষক উভয় সংকটে পড়েছেন। বাঁধ কেটে পানি নামাতে গিয়ে আরেকটি বিপদ সৃষ্টি হতে পারে। ভবিষ্যতে হাওরে বাঁধ দেওয়ার আগে এসব বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।”
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষক নেতা সালেহ আহমদ জানিয়েছেন, “খরচার হাওরের নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২০০ একর এবং আঙ্গারুলি হাওরের ৫০ একর জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।”
দিরাই উপজেলার ধল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দীন ইসলাম বলেন, “বরাম হাওরের নিচু এলাকার জমিতে পানি ধান নষ্ট করছে। কুলঞ্জ ইউনিয়নের বাদালিয়া হাওরেও একই অবস্থা। বরামের পাঠাকাউরি ও বাদালিয়া ব্লুইসগেট দিয়ে পানি ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু কালনী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তা বন্ধ রাখা হয়েছে, না হলে উল্টো পানি হাওরে ঢুকে যাবে।”
শাল্লার বড় কৃষক এবং শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া বলেন, “কিছু ধান বিলের তলানিতে রয়েছে। এগুলো বাঁচানো কঠিন। কিন্তু ওপরের রেকর্ডীয় জমিতেও পানি লেগেছে। উপজেলার ছাপটা, জুয়ারিয়া ও কুশিয়াল দাইড় হাওরের ১৫০ হেক্টর জমি ডুবেছে। বৃষ্টি হলে আরও জমি ডুবে যাবে। অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কারণে এই অবস্থা হয়েছে।”
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, “অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে ইতোমধ্যে ৩০% ধান পানির নিচে তলিয়েছে। এই ধান আরও এক সপ্তাহ পানির নিচে থাকলে কৃষক তা সংগ্রহ করতে পারবে না, নষ্ট হয়ে যাবে। প্রশাসন জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।”
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, “আমরা ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করি বাইরের পানি আটকানোর জন্য। গত কয়েক বছরে এবার এই সময়ে ৭০–১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় কৃষক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কারণ তাদের সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই অনেকেই বাঁধ কাটার চেষ্টা করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সভা করে জানিয়েছি, কৃষকরা যেন নিজ উদ্যোগে বাঁধ না কাটেন। কারণ যে কোনো বিপর্যয় ঘটলে বাঁধের কাটা অংশ দিয়ে পানি হাওরে ঢুকতে পারে। এতে ফসল আরও ঝুঁকিতে পড়বে। তাই উপজেলায় কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাঁধ কেটে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা হবে।”
আরএ/আরএন