নাটোরের সিংড়া উপজেলার সুকাশ ইউনিয়নের ২৪৭ জন হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিডব্লিউবি কর্মসূচির ৭.৪১০ মেট্রিক টন (ভিজিডি) চাল বিতরণ না করে বিক্রি করে দিয়েছেন চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন।
অভিযুক্ত চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন উপজেলা ১ নম্বর সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, গত ০৫ মার্চ উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদের ২৪৭ জন দুঃস্থ মহিলাদের জন্য বরাদ্দকৃত মার্চ মাসের ৭.৪১০ মেট্রিক টন চাল উত্তোলন করেন ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন। যার ডিও নম্বর: ৮৯১২৭০৪। পরবর্তীতে উত্তোলনকৃত চাল উপকারভোগীদের বিতরণ না করে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। পরে ওই ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাগ অফিসার বিআরডিবি কার্যালয়ের উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা বুলবুল হাসানের যোগসাজসে ১১ মার্চ চাল বিতরণ দেখিয়ে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র ও মাষ্টাররোল তৈরি করে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেন ইউপি চেয়ারম্যান।
তাছাড়া, কর্মসূচির শুরুতে ওই ইউনিয়নের ২৪৭ জন উপকারভোগী মহিলাদের বিনামূল্যে ব্যাংক একাউন্ট খোলার কথা থাকলেও জনপ্রতি এক হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়ার নয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কারো ব্যাংক একাউন্ট খোলা হয়নি। বরং ২৪৭ জন উপকারভোগীর কাছ থেকে প্রতি মাসের সঞ্চয় জনপ্রতি ২২০ টাকাও পকেটে তুলেছেন ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে সুকাশ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কমপক্ষে ১২ জন উপকারভোগী মহিলার সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা মার্চ মাসের কোনো ভিজিডি চাল পাননি। বিনামূল্যে তাদের ব্যাংক একাউন্ট খোলার কথা থাকলেও জনপ্রতি এক হাজার টাকা নেয়া হয়েছে এবং প্রতি মাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা করে সঞ্চয় জমা নিয়ে কোনো কাগজপত্র দেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান।
অপরদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে সকল অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদে যান উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুমি আকতার। সেখানে উপস্থিত অর্ধশত উপকারভোগী মহিলার কার্ডে রাতারাতি গত মার্চ মাসে ০৩ ও ১১ তারিখে পর পর দুই বার চাল বিতরণ করা হয়েছে ভুয়া টিপসহি ও স্বাক্ষর করে নাটক সাজান অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান। পরে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের সহযোগিতায় উপস্থিত কার্ডধারীরা চাল পাননি বিষয়টি স্বীকার করেন। এবং তাদের ভয়ভীতি ও মিথ্যা কথা শিখিয়ে সেখানে আনা হয়েছে বলেও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুমি আকতারের কাছে জবানবন্দি দেন উপস্থিত উপকারভোগী মহিলারা।
উপস্থিত উপকারভোগী জেসমিন, সাফিয়া, শিউলি, তাসলিমা, আজিরন, শরিফা, আরজুসহ অনেকেই বলেন, গত রাতে ইউপি চেয়ারম্যান তাদের কার্ড নিয়ে স্বাক্ষর করেছেন এবং সকলকে মিথ্যা কথা বলার জন্য ডেকে এনেছেন। কিন্তু এমন মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তারা এই চাল নিতে চান না। তাদের কার্ডের চাল ও সঞ্চয়ের টাকা পেলেই তারা খুশি।
এ বিষয়ে সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদের অনন্ত আট জন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউপি সদস্য মুঠোফোনে জানান, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের ভিডব্লিউবি কর্মসূচির বরাদ্দকৃত মার্চ মাসের কোনো চাল বিতরণ করা হয়নি। পরিষদ থেকে সদস্যরা তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধাও পান না। শুনেছি উপকারভোগীদের চাল বিক্রয় করেছেন চেয়ারম্যান। মার্চ মাসের চাল পেয়েছেন বলে উপকারভোগীদের এখানে শিখিয়ে আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম ও হিসাব সহকারী পরিতোষ কুমার বলেন, তাদের জানা মতে গত মার্চ মাসের বরাদ্দকৃত চাল বিতরণ হয়নি। উপকারভোগীদের বরাদ্দকৃত চাল ও সঞ্চয়ের টাকা-পয়সাসহ সকল বিষয়ে চেয়ারম্যান সাহেবই ভালো জানেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ট্যাগ অফিসার ও বিআরডিবি কার্যালয়ের উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা বুলবুল হাসান এই বিষয়টি এড়িয়ে তালবাহানা শুরু করেন।
আর সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়াম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, 'উত্তোলনকৃত চাল গত ১১ মার্চ ঈদের আগে বিতরণ করেছেন। কিন্তু কেউ কেউ পায়নি। কয়েকজন মেম্বার পরিষদে কম আসেন, তাদের ওয়ার্ড থেকে উপকারভোগীরা আসেনি। সেই চালগুলো পরিষদে রয়েছে।'
তবে তিনি কোনো চাল দেখাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়গুলো প্রকাশ না করতে বিভিন্ন মাধ্যমে এই প্রতিবেদককে প্রস্তাব দেন ইউপি চেয়ারম্যান।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোনোয়ারুল হাসান ও খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সালাম মন্ডল বলেন, 'সুকাশ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন গত ০৫ মার্চ ভিজিডির ৭.৪১০ মেট্রিক টন চাল গোডাউন থেকে উত্তোলন করে নিয়ে গেছেন। চাল উত্তোলনের সহযোগিতা করা পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব। পরবর্তী কার্যক্রম মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দেখবেন।'
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুমি আকতার বলেন, 'সুকাশ ইউনিয়নের উপকারভোগীদের মাঝে চাল বিতরণ করা হয়নি এমন অভিযোগে তদন্তে গিয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে এবং বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা হবে। ঈদের আগে সুকাশ ইউনিয়নের উপকারভোগীদের মার্চ মাসের চাল বিতরণ হয়েছে এমন মাষ্টাররোল ও প্রত্যায়নপত্র ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাঠানো হয়েছিল।'
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, 'বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।'
এসআই/এমএ