খুলনায় এলপি গ্যাসের দাম সাড়ে চারশ’ টাকা বেড়েছে। বুধবার থেকে নতুন রেটে দাম বাড়ায় বেশিরভাগ ডিলাররা কোম্পানীর কাছ থেকে গ্যাস উত্তোলন করেনি। আর দাম বাড়ানোর ঘোষণায় ২-৩ দিন আগ থেকেই খুচরা বাজারে ৮০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
একদিকে এক লাফে ৪৫০ টাকা দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে খুচরা বাজারে অস্বাভাবিক দামে সাধারণ ক্রেতারা বিপাকে পড়েছে। খোদ ডিলাররাই বলেছেন একজন নিম্মমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষদের পক্ষে ২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস কেনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তারা আরো বলেন, আন্তর্জাতিক দামের সাথে সমন্বয় করেই দাম বাড়িয়েছে কোম্পানীগুলো। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসা-বাড়িতে সাধারণত ১২.৫ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা বেশি। এই গ্যাসের দাম সরকরারী রেট অনুযায়ী ১ হাজার ৩৯৭ টাকা। অথচ খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হতো ১৪০০ থেকে ১৪৫০ বা ১৫০০ টাকায় বিক্রি হতো। কিন্তু গত ২-৩ দিন ধরে এই গ্যাসের দাম ১ হাজার ৯০০ খেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
খুলনার বিভিন্ন ডিলার পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আজ ১লা এপ্রিল থেকে দাম বাড়িয়েছে বিভিন্ন কোম্পানী। গতকাল ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১২.৫ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ছিল ১ হাজার ৩৯৭ টাকা। সেটি আজ ১লা এপ্রিল থেকে এক লাফে বেড়েছে ১ হাজার ৭৮৫ টাকা থেকে ১ হাজার ৯৪০ টাকা পর্যন্ত। অর্থ্যাৎ গ্যাসের দাম এক লাফে ৪৫০ থেকে ৪৬০ টাকা পর্যন্ত গড়ে বেড়েছে।
সূত্র জানায়, ১২.৫ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম যমুনা বাড়িয়েছে ১ হাজার ৭৮৫ টাকা। ইউনি গ্যাস ১ হাজার ৭৯৫ টাকা, ওমেরা ১ হাজার ৭৯৮ টাকা, বেক্সিমকো ১ হাজার ৯৪০ টাকা দাম নির্ধারণ করেছে।
বসুন্ধরা ডিলারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দাম বাড়ানোর কোন চিঠি দুপুর পর্যন্ত পাননি। তবে বিকাল নাগাদ পাওয়া যেতে পারে।
ডিলারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোম্পানীর রেটের থেকে ৫০-১০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি না করলে তাদের খরচ ওঠে না। এছাড়া বাসা-বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত যে খরচ হয় তাতে এক সিলিন্ডার গ্যাসের দাম খুচরা পর্যায়ে দাম পড়বে প্রায় ২ হাজার টাকা।
সাধারণ ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোম্পানী দাম বাড়ানোর আগেই গত ২-৩ দিন ধরে খুচরা পর্যায়ে অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে। ১২ কেজির ওমেরা বিক্রি হচ্ছে ১৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। একই দামে বিক্রি হচ্ছে সেনা। বসুন্ধরা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা পর্যন্ত। বেক্রিমকো ২ হাজার ২০০ টাকা এবং কোথাও ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু ডিলার দাম বাড়ার খবর জেনে আগেভাগেই গ্যাস মজুত করে রেখেছেন এবং সংকট দেখিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। আবার কেউ কেউ মজুত রাখা গ্যাস বিক্রি বন্ধ রেখে বলছেন কোম্পানী থেকে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে না।
আজ দুপুরে নগরীর দোলখোলা এলাকার আনিস গ্যাস হাউসে গিয়ে দেখা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানে যমুনা, ওমেরা ও ক্লিন হিট গ্যাস ১৯০০ টাকা এবং সেনা ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
জানতে চাইলে মালিক আনিস বলেন, গত ৩০ মার্চ থেকে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানী। তাদেরকে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা দরে কিনে ১ হাজার ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে অনেকেই দোকান বন্ধ রেখেছেন।
নগরীর জোড়াগেট আলফা গ্যাস, কমার্স কলেজস্থ আসাদ স্টোরে গিয়ে দেখা গেছে, অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে ওমেরা ডিলার পারভেজ হোসেন বলেন, ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডারের রেট ১ হাজার ৭৯৮ টাকা রেট ধরে দিয়েছে কোম্পানী। ফলে তাদেরকে ১ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। আর খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতাদের বাসা-বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হয়। সেখানেও খরচ আছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে খরচ পড়বে প্রায় ২ হাজার টাকা।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, একজন শ্রমজীবী, স্বল্প আয়ের মানুষ বা মথ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের গ্যাসে রান্না করা খুবই কষ্টের হয়ে পড়বে। একজন কর্মচারী যেখানে ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পান, তার পক্ষে ২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস কেনা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে বাসা-বাড়িতে গ্যাসের ব্যবহার কমে যাবে।
তিনি আরো বলেন, শহরে যারা বসবাস করেন, তাদের বড় একটি অংশ দরিদ্র। তাছাড়া শহরের বাসা-বাড়িতে গ্যাসের উপর নির্ভর করতে হয়। তাদেরকে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে।
জানতে চাইলে খুলনা জেলা এলপি গ্যাস ডিলার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাহের আজাদ বলেন, আন্তর্জাতিক দামের সাথে সমন্বয় রেখেই দাম বাড়িয়েছে কোম্পানীগুলো। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যালোচনা করলে দাম বাড়েনি। বর্তমানে বৈশ্বিক যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে আগামীতে টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাবে না।
ইউনিক কোম্পানীর এই ডিলার ও নেতা বলেন, ১৭৫০ টাকায় গ্যাস কিনে খুচরা পর্যায়ে ১৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার খুচরা ব্যবসায়ীদেরকে ভোক্তার বাড়ী-ঘরে পৌঁছে দেওয়ারও খরচ আছে। ২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস কেনা সাধারণ ক্রেতাদের বাইরে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, দাম বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়ায় অনেকেই গ্যাস উত্তোলন করছেন না। তাছাড়া গত কয়েকদিন ধরে কোম্পানীগুলো গ্যাস সরবরাহ করছে না। এ কারণে আমরাও গ্যাস দিতে পারছি না।
খুলনার কেন্দ্রীয় মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ডিপো ম্যানেজার জিয়াউর রহমান বলেন, সরকারী পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির নির্দেশ পাইনি। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। কোন সংকট নেই।
এদিকে হঠাৎ করেই গ্যাসের দাম এক লাফে ৪৫০-৪৬০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। দোলখোলায় গ্যাস কিনতে আসা একটি কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষক হাসিবুর রহমান বলেন, এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি। এ অবস্থায় এক লাফে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সংসার চালানো মুশকিল।
আসাদ স্টোরে গ্যাস কিনতে এসে হতাশা ব্যক্ত করেন হুমায়ুন কবীর। তিনি ডাকবাংলো মোড়ের একটি দোকানে ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরী করেন। কোনমতে তার সংসার চলে। গ্যাস না কিনেই ফিরে যান। তিনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এভাবে হয় না ভাই। যে টাকা নিয়ে এসেছিলাম তা দিয়ে কেনা হবে না। দেখি ধার দেনা করে পরে আসবো।
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব আ্যাডভোকেট বাবুল হওলাদার বলেন, প্রতিকুল অবস্থায়ও সরকার জ্বালানী তেলের দাম বাড়ায়নি। কিন্তু হঠাৎ করেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ হতাশ হয়েছে। দাম বৃদ্ধি থেকে সরে না আসলে মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে।
এসএমএস/এসআর