মাদকের স্বর্গরাজ্য খ্যাত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া পোড়াভিটা এলাকায় মন্ত্রীর আল্টিমেটামের সময়সীমা শেষ হলেও হরদম চলছে মাদক বিক্রি। মাদক ডিলারদের আড়ালে রেখে মাদকসেবীরা গ্রেফতার হলেও মূল ব্যবসায়ীরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গত ৩ মার্চ গোয়ালন্দ উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের এমপি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, আগামী ৭ দিনের মধ্যে চাঁদাবাজ ও মাদককারবারীরা তাদের অপকর্ম থেকে বিরত না হলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, “আমার নিজ দল, পুলিশ ও প্রশাসনের লোকদের মধ্যেও অনেকের মাদক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে আমি জানি। এমনকি যারা আমাকে আজ ফুল দিতে এসেছেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। আমি আজ সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে যাচ্ছি। মাদক ব্যবসায়ী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের অপকর্মের দায় আমি বহন করতে রাজি নই।”
এই আল্টিমেটামের পর কয়েকদিন পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরের অভিযান চললেও ঈদের আগেই তা থেমে যায়। এরপর আগের মতোই পোড়াভিটাসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাদকের সক্রিয়তা বেড়ে যায়। অভিযানে কিছু খুচরা বিক্রেতা ও সেবী আটক হলেও মূল কারবারিরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, তারা নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এমনকি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কিছু মাদক কারবারিও এলাকায় অবস্থান করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আগে আজিজ প্রামাণিক মাসোহারা সংগ্রহ করলেও বর্তমানে আলাই প্রামাণিক নামে একজন তা সংগ্রহ করে বিভিন্ন দপ্তরে পৌঁছে দেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর লাগোয়া কয়েকশ মিটার এলাকায় ‘পোড়াভিটা’ নামে পরিচিত একটি বসতি রয়েছে। এখানে মূলত বৃদ্ধ যৌনকর্মী, তাদের সন্তান ও স্বজনরা বসবাস করেন। অভিযোগ রয়েছে, এখানকার অনেকেই মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
আরও অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার ছত্রচ্ছায়ায় মাদক কারবার চলছে। অন্য এক নেতা তার ছেলে ও ভাইদের মাধ্যমে বিয়ার ও হেরোইনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। বর্তমানে বিয়ারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা, সঙ্গে রয়েছে যুবদলের কয়েকজন সদস্য এবং ফরিদপুর থেকে আসা অশোক নামের এক ব্যক্তি।
হেরোইনের শীর্ষ ডিলার হিসেবে দৌলতদিয়ার জাহাঙ্গীর হাওলাদার (৪৮) ও তার স্ত্রী মুক্তা বেগম (৪০)-এর নাম উঠে এসেছে। তারা উজানচর ইউনিয়নের নতুনপাড়া মাল্লাপট্টি এলাকায় একটি তিনতলা ভবনে বসবাস করেন। একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রভাবশালীদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা করে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলেও জানা যায়।
এছাড়া আরও কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ সরাসরি বিক্রি করেন, আবার কেউ নিয়ন্ত্রণ করেন পাইকারি সরবরাহ।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনেকেই নিজ ঘরের সামনে বসেই মাদক বিক্রি করেন। খদ্দের এলেই জিজ্ঞেস করা হয়, “কী লাগবে?” টাকা নিয়ে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় মাদক। এখানে ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবা সহজলভ্য।
এলাকার বিভিন্ন স্থানে—লঞ্চ ও ফেরিঘাট, বাসস্ট্যান্ড, মহাসড়কের পাশ, ফাঁকা মাঠ ও নির্জন জায়গায়—প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও বিক্রি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযান চললেও তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, অভিযানে সাধারণত মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতারাই গ্রেফতার হন। তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়েন। অন্যদিকে মূল হোতারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, তারা সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত অর্থ দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফলে মাদকসেবীর সংখ্যা কমছে না, বন্ধ হচ্ছে না ব্যবসাও। একজন খুচরা বিক্রেতা গ্রেফতার হলে তার জায়গায় নতুন কাউকে বসানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুমিনুল ইসলাম বলেন, “থানা পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঈদের সময় দৌলতদিয়া ঘাটে বাড়তি নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকতে হয়েছে। তবে ঈদের পর আবারও অভিযান জোরদার করা হবে।”
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু আব্দুল্লাহ জাহিদ বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। ঈদের সময় কিছুটা কম থাকলেও আবারও অভিযান জোরদার করা হবে। ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পোড়াভিটা এলাকায় ১১৭টি মামলা করা হয়েছে। অনেক আসামি জামিনে থাকায় তারা পুনরায় ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।”
এসআই/আরএন