পঞ্চগড়ে আকস্মিক ঝড়ে গাছ ভেঙে ঘরে চাপা পড়ে চাকাতি বালা (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১ টার দিকে পঞ্চগড় উপজেলা সদরের চানপাড়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় পৌর শহরসহ উপজেলা জুড়ে হাজারের বেশি ছোট বড় গাছ উপড়ে গেছে। ভুট্টা, মরিচ ক্ষেতসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আম ও নিচুর মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
শনিবার সকালে পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহমিদা সুলতানাসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় নিহতের পরিবারসহ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে সদর উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক অনুদানসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ১২ টার দিকে প্রথমে বৃষ্টির সাথে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। প্রচণ্ড বাতাসে চাকাতি বালার বসতঘরের পাশে থাকা একটি বিশাল 'সড়কজিয়া' গাছ উপড়ে সরাসরি ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং বৃদ্ধা চাকাতি বালা গাছের নিচে চাপা পড়েন। ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এছাড়া, উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের ঘাটিয়ারপাড়া এলাকায় ঝড়ের সময় বসত ঘরের উপর পাশের চারতলা নির্মাণাধীন বাসার দেয়াল ধসে ময়নুল ইসলাম (৫০) ও তার স্ত্রী খুকুমনী (৩৮) আহত হয়েছেন। পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা ও আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আকস্মিক ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে সদর উপজেলার হাড়িভাসা, চাকলাহাট, মাগুড়া, ধাক্কামারা ইউনিয়ন এবং আটোয়ারী উপজেলার ঝলই শালশিরি, মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাড়ি ঘর ও গাছপালা ভেঙে গেছে। এসব এলাকার ভুট্টা ও মরিচ ক্ষেতসহ ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। গাছ পড়ে বিভিন্ন সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুত ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন স্বাভাবিক হয়নি। মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ হয়ে যায়।
নিহত বৃদ্ধার ছেলে হরেণ চন্দ্র জানান, "মা ওই ঘরে একাই ছিলেন। ঝড়ের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে গাছটি পড়ার পর আমরাও ঘর থেকে বের হতে পারিনি। পরে ঝড় থামলে আমরা গিয়ে মাকে মৃত অবস্থায় পাই।"
পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, হঠাৎ এই ঝড়ে আমাদের এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছ চাপা পড়ে এক বৃদ্ধার মৃত্যুর পাশাপাশি এলাকায় গাছ পড়ে একটি গরু মারা গেছে।
আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পানপাড়া এলাকার সুরুজ আলী বলেন, আমার মরিচ ও ভুট্টা ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমার বাড়ি উপর দুইটি মেহগনি গাছ ভেঙে পড়ে একটি ঘর ভেঙে গেছে।
সদর উপজেলার ৩নং সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল ইমরান বলেন, রাত একটার দিকে আমাদের সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঝড় শুরু হয়। গোটা ইউনিয়নে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চানপাড়া এলাকা এক বৃদ্ধা, উনি রান্না ঘরেই ঘুমান। রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঝড়ের কারণে একটি গাছ তার রান্না ঘরে পড়ে তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। আমাদের এলাকায় ইউএনও সাহেব এসেছেন। তিনি আর্থিক অনুদানসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাৎক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন।
জেলা প্রশাসক মোছা. শুকরিয়া পারভীন জানান, ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণের চেষ্টা চলছে। আমরা কিছু কিছু এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সহযোগিতা করছি।
একই কথা জানান, গরিনাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন দীপু।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, মৌসুমি বায়ু হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠায় এই বৃষ্টিপাত ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার। তবে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, এই ঝড়ের পেছনে কোনো নিম্নচাপের প্রভাব নেই। এটি মূলত মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ।
আবহাওয়া অফিস আরও জানিয়েছে, আগামী ১লা এপ্রিল জেলাজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে আরও প্রবল বেগে ঝড়ো হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টির উচ্চ আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এসআইএস/এসআর