মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পুরো রমজান মাসে পর্যটকশূন্য অবস্থা বিরাজ করছে। সংরক্ষিত এই বনে পর্যটকের আনাগোনা না থাকায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে বন্যপ্রাণীরা। উল্লুকের চেঁচামেচি, বানরের লাফালাফি, পাখির কিচিরমিচিরে নতুন রূপে ফিরতে শুরু করেছে লাউয়াছড়া। সরেজমিনে দেখা যায়, লাউয়াছড়া বনের গাছে গাছে বন্যপ্রাণীদের লাফালাফি ও খাবারের সন্ধানে তাদের অবাধ বিচরণ।
বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকসহ বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজিতে সমৃদ্ধ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। কয়েক দশকে এই প্রাকৃতিক বনের গভীরতা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। পুরনো বহু গাছগাছালি চুরি হওয়া, বনের ভেতর দিয়ে উচ্চ শব্দে ট্রেন চলাচল, সড়কে যানবাহনের অযথা হর্ন, অত্যধিক দর্শনার্থীর বিচরণ, হইহুল্লোড়, পার্শ্ববর্তী টিলাভূমিতে হোটেল-কটেজ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বন ও বন্যপ্রাণী।
স্থানীয়রা জানান, চলমান পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়ত উৎফুল্ল প্রাণীদের লাফালাফি, অবাধ বিচরণ ও খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানোর চিত্র চোখে পড়ে।
দেশের বিভিন্ন স্থানের ৪৩টি জেলা ঘুরেছেন ট্রাভেলার এঞ্জেলা। সোমবার ঘুরতে আসেন কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বন বনের মতো থাকুক—এটাই আমরা চাই। বনে যেন মানুষ অবাধে না ঘোরে, সে জন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ তিনি বলেন, ‘যখন পর্যটক অবাধে ঢুকে, তখন প্রাণীদের অনেক ক্ষতি হয়। তাছাড়া পর্যটকরা বাইরে থেকে খাবার নিয়ে বনে প্রবেশ করে প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে ফেলে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রাণীরা বনের খাবারই খাবে—এটাই স্বাভাবিক। পর্যটক কম থাকায় প্রাণীরা অবাধে ঘুরছে, যা আমাদের দেখতেও ভালো লাগছে।’
লাউয়াছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা সাজু মারছিয়াং বলেন, ‘এই বনে প্রতিনিয়ত পর্যটকদের ভিড় দেখা যেত। তবে প্রথম রমজান থেকে লাউয়াছড়া বনে এখন পর্যটক নেই। এতে বনে ফিরে এসেছে নতুন রূপ। সকাল থেকে উল্লুকের আওয়াজ, বিভিন্ন প্রজাতির বানরের লাফালাফি, পাখির কিচিরমিচির শব্দ, সন্ধ্যায় বনমোরগের ডাকে বনটিতে ফিরে এসেছে হারানো প্রাণ।’
তিনি বলেন, ‘এখন সকালের দিকে কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কে যাতায়াতকালে বনের ভেতরে মায়া হরিণের ডাকও শোনা যায়। আগে পর্যটকদের উপস্থিতিতে সচরাচর এমন ডাক শোনা যেত না।’
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দায়িত্বরত টিকিট মাস্টার বলেন, ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে এই সময়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ থেকে সাতশ দেশি-বিদেশি পর্যটক আসতেন। তখন টিকিট বিক্রি করে সরকারের রাজস্ব আয় হতো ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এখন গড়ে ৭ থেকে ৮ জন পর্যটক আসছেন।’ তিনি বলেন, ‘পর্যটক কম থাকায় প্রাণীরা অবাধে ঘোরাফেরা করছে। দেখতেও ভালো লাগছে।’
স্থানীয় পরিবেশকর্মী এস কে দাস সুমন বলেন, ‘এখন পর্যটক নেই, নেই মানুষের হইহুল্লোড়। নীরব, নিস্তব্ধ পরিবেশে রয়েছে বন্যপ্রাণীরা। এটি বন্যপ্রাণীর জন্য স্বস্তির পরিবেশ। এভাবে যদি সবসময় পর্যটক কম থাকত, তাহলে প্রাণীদের জন্য ভালো হতো।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানটিতে পুরনো প্রাকৃতিক গাছগুলো ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কাঠচোরদের অপতৎপরতাসহ নানাবিধ কারণে এই বনের অবস্থা সংকটাপন্ন। বন ফাঁকা হওয়ায় হুমকির মুখে পড়ছে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জনমানবশূন্য ও যানবাহনের চলাচল কম থাকায় বনটি নতুন রূপ ধারণ করছে। আসলে দিনে মানুষের চলাচলের কারণে প্রাণীরা অবাধ চলাচলে ভয় পেত। এখন মানুষের চলাচল না থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে রয়েছে বন্যপ্রাণীরা।’
পরিবেশবাদী আ স ম সালেহ সোহেল আরও বলেন, ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটক সীমিত করতে হবে। বছরে যদি ৩-৬ মাস বনের ভেতর মানুষের যাতায়াত বন্ধ রাখা যায়, তাহলে প্রাণীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে। এরপর বাকি ৬ মাস যদি পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে সেটিও সীমিত রাখতে হবে। এছাড়া বনের ভেতরে যে রেললাইন ও সড়কপথ আছে, তা বাইপাস করা গেলে বনের প্রাণীরা বাঁচবে। তা না হলে একদিন বন হারিয়ে যাবে।’
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের লাউয়াছড়া বন রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, ‘পবিত্র মাহে রমজান মাস চলছে। লাউয়াছড়া বনে পর্যটক নেই বললেই চলে। পাশাপাশি পর্যটকদের তেমন আসতেও দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে ৭-৮ জন পর্যটক দেখা মেলে। পর্যটকশূন্য, ট্রেন চলাচল বন্ধ ও যানবাহন চলাচল কম থাকায় বন্যপ্রাণীদের মধ্যে স্বস্তিবোধ হওয়া স্বাভাবিক।’
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে লাউয়াছড়া বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে সেখানে পর্যটক বেড়েছে। দেশের ৭টি বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল লাউয়াছড়া অন্যতম। ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে এই বনে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখা যায়। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য বনটি বিখ্যাত। এ ছাড়া এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদ।
আরএন