ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ঈদে বাড়ে দর্শক, তবুও টিকে থাকা কঠিন: শ্রীমঙ্গলের সিনেমা হলগুলো সংকটে
✎ রুপম আচার্য্য
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৪ পিএম
X

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একসময় বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল স্থানীয় সিনেমা হলগুলো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং দর্শক সংকটের কারণে এখন এই খাতটি গভীর সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে শহরের পুরোনো দুটি সিনেমা হল বর্তমানে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সারা বছর প্রায় লোকসান গুনতে হয় হল মালিকদের। নিয়মিত দর্শক না থাকায় বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসা সচল রাখার চেষ্টা করেন তারা।

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে নতুন সিনেমা মুক্তি পেলে কিছুটা দর্শক বাড়ে। এ সময় মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আগ্রহ দেখালেও তা দিয়ে সারা বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। বরং নতুন ও ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে মালিকদের আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়। উচ্চমূল্যে সিনেমা কিনেও প্রত্যাশিত টিকিট বিক্রি না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হয়।

শ্রীমঙ্গলের চারটি সিনেমা হলের মধ্যে ‘চিত্রালী সিনেমা হল’ দীর্ঘ কয়েক বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন লোকসান সহ্য করতে না পেরে হলটি বন্ধ করে অন্য ব্যবসার জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে। চিত্রালী সিনেমা হলের আগে বন্ধ হয়ে যায় বিডিআর সিনেমা হল। তা বন্ধ হয়ে এখন পরিণত হয়েছে বিজিবি মিলনায়তনে।

এক সময় এই ৪টির সবকটি সিনেমা হল ছিল বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চ বিলাসী সবাই ছুটে যেতেন একটু বিনোদনের আশায় পরিবার পরিজন নিয়ে। এখন যাওয়া তো দূরের কথা হলগুলোর দিকে ফিরেও তাকাতে নারাজ দর্শকরা। 

বর্তমানে চালু থাকা হলগুলোর মধ্যে ভিক্টোরিয়া সিনেমা হল সবচেয়ে পরিচিত হলেও সেটিও চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। সারাবছর লোকসান গুনতে গুনতে ঈদে ব্যবসার আশা থাকলেও ব্যয়বহুল সিনেমা এনে মূলধন তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতেও সমস্যায় পড়ছেন মালিকপক্ষ। হলটি মূলত পারিবারিক স্মৃতি রক্ষার জন্যই চালু রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ঠিকে রয়েছে রাধানাথ সিনেমা হল। বর্তমানে এই হলে কাজ করছেন সাতজন কর্মচারী। কিন্তু নিয়মিত আয় না থাকায় তাদের জীবনযাপন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। হলের ম্যানেজার জীবিকার তাগিদে হলের সামনেই ছোট দোকান দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

রাধানাথ সিনেমা হলের ম্যানেজার জহির খন্দকার বলেন, “সারাবছরই এখন সিনেমা হল চরম দুর্দশার মধ্যে থাকে। আগের মতো আর দর্শক আসে না। কারণ এখন মানুষ মোবাইলেই সবকিছু পেয়ে যায়। সিনেমা হলের কোনো পোস্টার দেখলেই অনেকে অশ্লীল বলে মন্তব্য করেন, কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু নেই। বর্তমানে সুষ্ঠু ধারার ভালো চলচ্চিত্রই নির্মিত হচ্ছে, বিশেষ করে ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো মানসম্মত হয়। তবে এসব ছবি আনতে খরচ অনেক বেশি হওয়ায় হল মালিকরা আগ্রহী হন না। আরেকটি বিষয় হলো, দর্শক এখন মূলত শাকিব খান-এর ছবিই দেখতে চান। অন্য নায়কদের ছবি হলে তেমন দর্শক পাওয়া যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “সারাবছর ভালো ও নিয়মিত ছবি না আসায় অনেক সময় হল বন্ধই রাখতে হয়। এবার ঈদেও মালিক হল চালাতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। কিন্তু আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করছি প্রায় ৪০ বছর হয়ে গেছে। আমরা কোথায় যাব? আমাদের তো অন্য কোনো জায়গা নেই। মালিক বলেছেন, তিনি আর টাকা দিতে পারবেন না; আমরা চাইলে নিজেরা চালাতে পারি। কিন্তু এত ব্যয়বহুল ছবি এনে সেই টাকা উঠবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই এবার ঈদে হল চালু রাখা নিয়েও আমরা অনিশ্চয়তায় আছি। মালিকপক্ষ মূলত হল বন্ধ রাখার পক্ষেই।”

অন্যদিকে ভিক্টোরিয়া সিনেমা হলের পরিচালক এস কে দাশ সুমন বলেন, “বর্তমানে দেশের অধিকাংশ সিনেমা হল জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। আসনগুলোতে ধুলোর স্তর জমে গেছে। একসময় যা ছিল গণমানুষের প্রধান বিনোদনের মাধ্যম, তা এখন প্রায় মৃতপ্রায় এক স্মৃতি। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, হাতে হাতে স্মার্টফোন- এসবের কারণে সিনেমা শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে। সারা বছর অল্পসংখ্যক দর্শক নিয়ে হলগুলো টিকে থাকার চেষ্টা করে। ঈদ এলেও মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাবে দর্শককে হলমুখী করা যায় না। যদিও এক-দুটি ভালো ছবি আসে, কিন্তু সেগুলোর উচ্চমূল্যের কারণে হল মালিকরা ঝুঁকি নিতে পারেন না।”

তিনি আরও বলেন, “স্মার্টফোন, বড় টিভি ও সহজ ইন্টারনেট ব্যবস্থার কারণে সিনেমা হলের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। পাশাপাশি মানহীন চলচ্চিত্র নির্মাণ, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এবং হলগুলোর পরিবেশ উন্নয়ন না হওয়াও বড় কারণ। সিলেট বিভাগে একসময় অসংখ্য সিনেমা হল ছিল, যা ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান বিনোদনের মাধ্যম। দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষও দিনের শেষে বিনোদনের জন্য হলে যেতেন। কিন্তু এখন সিলেটে প্রায় ৯০ শতাংশ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। যে অল্প কিছু হল এখনো চালু আছে, সেগুলোও মূলত স্মৃতি রক্ষার জন্য টিকিয়ে রাখা হয়েছে।”

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাব এবং হলগুলোর পরিবেশ উন্নত না হওয়াও এ সংকটের বড় কারণ। পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কর সুবিধা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

বর্তমান অবস্থায় অনেক মালিকই সিনেমা হল ব্যবসা চালিয়ে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। কেউ ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছেন, আবার কেউ বন্ধের পরিকল্পনা করছেন।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ঈদকে ঘিরে সাময়িক চাঙাভাব এলেও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সিনেমা হল শিল্প এখন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ের মুখে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা, বিনিয়োগ এবং সময়োপযোগী আধুনিকায়ন।

এসআর


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝