মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম জফলারপার (পাঞ্জিবাড়ি)। প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ঘেরা এই গ্রামটি এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘পাখিদের গ্রাম’ নামে। গ্রামের মানুষ পাখিদের শিকার না করে বরং নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে। আর সেই আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এখানে গড়ে তুলেছে তাদের স্থায়ী আবাস।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় ১০ বিঘা কৃষিজমির পাশে একটি বড় বাঁশঝাড় এবং আশপাশের উঁচু গাছে গাছে পাখির বাসা। লম্বা পা ও ঠোঁটের হালকা ধূসর বর্ণের বড় আকারের শামুকখোল পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে বাসা বেঁধে প্রজনন করছে। তাদের ডানা ঝাপটানি আর কিচিরমিচির শব্দে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
ভোর হতেই বাঁশঝাড়ে শুরু হয় পাখিদের কোলাহল। দলবদ্ধভাবে আকাশে উড়ে বেড়ানো, ডালে ডালে বসে থাকা আর নির্ভয়ে বিচরণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন গ্রামটিতে।
স্থানীয়রা জানান, শীতপ্রধান দেশ সাইবেরিয়া থেকে খাদ্যের সন্ধানে এসব পরিযায়ী পাখি এখানে আসে। আগে শীতকালে এলেও এখন প্রায় সারা বছরই দেখা মেলে তাদের। প্রায় এক যুগ ধরে পাখিগুলো এখানে অবস্থান করছে এবং ধীরে ধীরে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছে।
তারা জানান, এখানে বক, সারস, বুনো হাঁস, বালি হাঁস, পানকৌড়ি, হড়িয়াল ও হাড়গিলা প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। তবে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি শামুকখোল ও হাড়গিলা। প্রায় ৭ থেকে ৮ মাস আগে পাখিগুলোর আগমন শুরু হলেও এখন সংখ্যায় আরও বেড়েছে। বাঁশঝাড় ও আশপাশের গাছের ডালে ডালে তৈরি হয়েছে অসংখ্য বাসা। অনেক বাসায় রয়েছে ডিম ও সদ্য ফুটে ওঠা বাচ্চা।
প্রতিদিন সকালে পাখিগুলো আশপাশের বিল, জলাশয় ও পুকুরে খাবারের সন্ধানে যায়। শামুক ও বিভিন্ন পোকামাকড় তাদের প্রধান খাদ্য। বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে আবার তারা ফিরে আসে নিজেদের বাসায়। এ সময় অন্য পাখিরা ডিম ও বাচ্চা পাহারা দেয়। পাখির কিচিরমিচির শব্দে বিরক্ত না হয়ে বরং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে এসেছে স্থানীয়রা। কেউ যাতে পাখি শিকার করতে না পারে সেজন্য তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন।
কমলগঞ্জ মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সোবহান বলেন, ‘আগে শীতের শুরুতে পাখিগুলো আসত আর গরমের শুরুতে চলে যেত। কিন্তু এলাকাবাসী তাদের বিরক্ত না করায় প্রায় এক যুগ ধরে পাখিগুলো এখানেই থেকে যাচ্ছে। এখন তারা গাছে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ছে, বাচ্চা ফোটাচ্ছে।’
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থী রাকিবুল ইসলাম রকি বলেন, ‘দেশীয় অনেক পাখি এখন বিলুপ্তির পথে। এখানে এত পাখির সমাবেশ দেখে খুব ভালো লাগছে। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য সত্যিই বিরল।’
স্থানীয় বাসিন্দা আবু হাসনাথ স্বপন বলেন, ‘পাখিগুলো দেখতে অনেকটা ঘরে পালা হাঁসের মতো। সারাদিন তাদের ওড়াউড়ি আর ডাক শুনে মন ভরে যায়। আমরা কাউকে পাখি শিকার করতে দিই না। তবে মাঝে মাঝে রাতে কেউ বাচ্চাসহ পাখি চুরি করে নিয়ে যায়। প্রশাসনের নজরদারি বাড়ালে এখানে পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলা সম্ভব।’
পাখি প্রেমী সাংবাদিক সালাহউদ্দিন শুভ বলেন, ‘অনেক সময় উঁচু গাছ থেকে পড়ে কিছু পাখি আহত হয়। কেউ যদি অসুস্থ পাখি আমাদের কাছে দেয়, তাহলে আমরা ‘আরাম ঘর’-এ চিকিৎসা দিয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে আবার প্রকৃতিতে অবমুক্ত করতে পারব।’
মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার বলেন, ‘স্থানীয়দের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমরা সেখানে সভা-সেমিনার আয়োজন ও বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেব।’
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিগুলোর নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। কেউ পাখি শিকার করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসআর