বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা রুমায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে চরম জনবল সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। একই সঙ্গে উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার মানও ব্যাহত হচ্ছে।
রুমা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, রুমা উপজেলায় উপজেলা শিক্ষা অফিসারের (টিও) পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বর্তমানে আশিষ চিরান অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসারের (এটিও) অনুমোদিত দুটি পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। এছাড়া অফিস সহকারীর পদও শূন্য থাকায় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
উপজেলার ৬৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৪টি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজ ও পাঠদান সামলাতে গিয়ে শিক্ষকরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে পড়ছেন, যার প্রভাব শিক্ষার মানের ওপর পড়ছে।
শুধু প্রধান শিক্ষকই নয়, উপজেলায় সহকারী শিক্ষকেরও প্রায় ৪৪টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে — নিয়াংখিয়াং পাড়া, জুরবারং পাড়া, প্রাংশা পাড়া, নাইতং পাড়া, বাচারদেউ পাড়া, ফুংআল পাড়া, নুনথিয়ার হেডম্যান পাড়া, পাকনিয়ার পাড়া, লেক পাড়া, সেপ্রু পাড়া, দানাগ্রী পাড়া, পান্তলা হেডম্যান পাড়া, যথুরাম পাড়া, গালেংগ্যা পাড়া, কালা পাড়া, রামদু পাড়া, পলিতং বেথেলহেল পাড়া, ম্রংখু পাড়া, পাইনং মেনরন, লেম্পু পাড়া, প্রংফুমগ পাড়া, ব্যাংকেন পাড়া, আবুলাম্বা পাড়া, দার্জিলিং পাড়া, কেসপাই পাড়া, মাংতং পাড়া, পাইন্দু উজানী পাড়া, তংমক পাড়া, অর্জুন পাড়া, চৈক্ষ্যং পাড়া, ডুলাচান পাড়া, ক্যম্বুওয়া পাড়া, মেনতক পাড়া, বাকত্নাং পাড়া, এলিম সাংদালা পাড়া, ক্যতাই পাড়া, চলংক পাড়া, হমত্রি পাড়া, নতুন পাড়া, রুইতু পাড়া, প্রংপ্রু মক পাড়া, চিনলংক পাড়া এবং বগামুক পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
রুমা উপজেলা আশ্রম পাড়া অগ্রবংশ অনাথালয় নির্বাহী পরিচালক উঃ নাইন্দিয়া থের জানান, ২০১৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত শিক্ষা মান নিয়ে তিনি অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তিনি বলেন, “রুমা উপজেলা দুর্গম এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার মান এবং শিক্ষক সংকট নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকায় এই পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষার মান উন্নত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রধান শিক্ষক পদে সংকট থাকায় শিক্ষার মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
চিত্ররথ চাকমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চিত্ত রঞ্জন চাকমা জানান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস না থাকায় আমরা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাচ্ছি না। অফিসের কার্যক্রমেও নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। স্কুল পরিদর্শনের অভাবে রুমার প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন পিছিয়ে আছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা শিক্ষা অফিসার আশিষ চিরান বলেন, রুমা উপজেলা দুর্গম এলাকা হওয়ায় শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমেও চাপ পড়ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত পদগুলো পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, পাহাড়ি এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখতে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া জরুরি। অন্যথায় দুর্গম এ পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
ইউএম/আরএন