পটুয়াখালীর দশমিনায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবারের মতো রঙিন ফুলকপি চাষ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নারী কৃষক সালেহা বেগম। ব্যতিক্রমী এই সবজি চাষে তিনি বাম্পার ফলনের পাশাপাশি পেয়েছেন ভালো বাজারমূল্য। এটি রীতিমত উপজেলার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। উপজেলায় প্রথম রঙিন ফুলকপির বাগান দেখতে ভিড় করেছেন আশেপাশের এলাকার মানুষ। সালেহার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতে এ জাতীয় ফুলকপি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন উপজেলাটির অনেক কৃষক।
সালেহা উপজেলার বহরমপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ আদমপুর গ্রামের কৃষক সুলতান সরদারের স্ত্রী। বাড়ির আশেপাশের নিজ জমিতে দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করে আসছেন। শীত মৌসুমে তিনি বিভিন্ন সবজির পাশাপাশি নতুন জাতের রঙিন ফুলকপি চাষ করে আশানুরূপ ফলনের পাশাপাশি ভালো দাম পেয়েছেন।
জানা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট ও রিসাইলিয়েন্ট এগ্রিকালচারাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড নেট ইনকাম সাপোর্ট প্রকল্পের আওতায় কৃষক সালেহা সবুজ, হলুদ, বাসন্তি, বেগুনী ও গোলাপি জাতের রঙিন ফুলকপি চাষ করেছেন। মোট ৩৩ শতাংশ জমিতে বিভিন্ন রঙের প্রায় আড়াই হাজার পিস ফুলকপি চাষ করে তিনি সফল হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে প্রথম রঙিন ফুলকপি চাষ করা হয়। তবে দশমিনায় এবারই প্রথম এ জাতীয় ফুলকপির চাষ হয়েছে। সাধারণ ফুলকপির চেয়ে এসব ফুলকপির পুষ্টিগুণ বেশি এবং খেতেও বেশি সুস্বাদু। বাংলাদেশে খুব কম চাষ হলেও, বেশি দাম ও চাহিদার কারণে কৃষিপণ্য হিসেবে এটি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কৃষক সালেহা দ্য ডেইলি অবজারভারকে বলেন, “দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে নতুন এ জাতীয় সবজি চাষ করে বিভিন্ন হাট-বাজারে পাঠিয়ে বিক্রি করেছি। এছাড়া অনেক সবজি ব্যবসায়ী প্রতিদিন সকালে খামারে এসে পাইকারি দামে নিয়ে গেছে। একই খরচে সাধারণ জাতের তুলনায় অনেক বেশি দাম পেয়েছি। এসব রঙিন ফুলকপির দামী বীজ ও জৈব সার কৃষি অফিস থেকে আমাকে বিনামূল্যে দিয়েছিল। চাষাবাদের খরচ বাবদ নগদ ৪ হাজার টাকাও পেয়েছি। পরিচর্যার জন্য আমার আরও ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। চলতি বছরে প্রথমবার ৩৩ শতাংশ জমিতে চাষ করে আমি প্রায় এক লক্ষ টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছি।”
সাধারণ ফুলকপির মতো একই পরিশ্রম ও খরচে এই রঙিন ফুলকপি আকারে বড় এবং দাম বেশি হওয়ায় অনেক লাভবান হয়েছেন তিনি। একেকটি কপির ওজন এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত হয়েছে। রোপণের মাত্র ৭০–৭৫ দিনের মধ্যেই বিক্রি করা গেছে।
অবজারভারকে তিনি আরও বলেন, “প্রতিদিনই রঙিন ফুলকপি দেখতে ভিড় করেছেন অনেকে। কেউ ফুলকপি কিনছেন, আবার কেউ চাষের বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন।”
কম খরচে বেশি দাম পাওয়ায় অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন ভবিষ্যতে এ জাতের ফুলকপি চাষে। দশমিনা সদর ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামের কৃষক আলম হাওলাদার বলেন, “সালেহা বেগমের চাষ-রোপিত রঙিন ফুলকপি দেখেছি। তার কাছ থেকে চাষাবাদের পদ্ধতি সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিয়েছি। ভবিষ্যতে আমিও এই রঙিন ফুলকপি চাষ করবো।”
বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ দাসপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, “স্বাদ কেমন তা দেখতেও ক্ষেত থেকেই ১০০ টাকা দিয়ে একটি হলুদ ও একটি গোলাপি ফুলকপি কিনেছি।”
দশমিনা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী পরিতোষ কুমার বলেন, “সালেহা বেগমের উৎপাদিত রঙিন ফুলকপি পাইকারি দরে বাজারে আনা মাত্রই বিক্রি হয়ে গেছে। সোয়া কেজি ওজনের বড় আকৃতির একটি ফুলকপি ৬৫ টাকায় বিক্রি করেছি।”
একই বাজারের আরেক সবজি ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেন বলেন, “মানুষ খুবই আগ্রহী হয়ে ভালো দাম দিয়ে এই ফুলকপি কিনছে।”
দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ দ্য ডেইলি অবজারভারকে বলেন, “দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রঙিন ফুলকপি চাষে কৃষকরা অভাবনীয় সাফল্য পাচ্ছেন। উন্নত প্রযুক্তিতে কম খরচে বিষমুক্তভাবে উৎপাদিত এই রঙিন ফুলকপি সাধারণ কপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। এটি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ভবিষ্যতে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে।”
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) শাহাদাত হোসেন বলেন, “রঙিন ফুলকপিতে সাদা ফুলকপির তুলনায় পুষ্টিগুণ ও বাজারমূল্য দুটোই বেশি। এসব জাতের ফুলকপির আবাদ সম্প্রসারিত হলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বরিশাল অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, “সম্প্রতি আমি দশমিনায় খামারটি পরিদর্শন করেছি। রঙিন ফুলকপি উপজেলাটিতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শুধু জৈব সার ব্যবহার করেই এটি চাষ করা যায়। আমরা কৃষকদের এ জাতের সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করছি এবং কৃষি বিভাগ থেকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছি। আগামীর কৃষি ও কৃষি অর্থনীতিতে রঙিন ফুলকপি নতুন মাত্রা যোগ করবে, এমন প্রত্যাশা রয়েছে।”
আরএন