আমরা সবাই জানি, চেকের মামলায় রায় হলে নালিশী চেকের ৫০ শতাংশ টাকা জমা দেওয়া ব্যতিত জামিন ও আপিল করা যায় না। কিন্তু আইনানুগ ভাবে ৫০ শতাংশ টাকা জমা না দিয়েও আপনি আইনত জামিন পাওয়ার অধিকারী। কারণ, ৫০ শতাংশ টাকা সংগ্রহের জন্য ব্যক্তির সময় লাগতে পারে এবং আপিল দায়েরের জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় প্রয়োজন বিষয় জানিয়ে আপনি অন্তবর্তীকালীন জামিন পেতে পারেন।
চেকের মামলায় ১৩৮এ ধারা অনুযায়ী, বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে চেকের সমপরিমাণ টাকার অন্তত ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট আদালতে জমা দিতে হয়। এটি সাধারণ নিয়ম।
অপরদিকে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ (২ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আদালত কর্তৃক অনূর্ধ্ব এক বৎসর মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং উক্ত দণ্ডের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তি আপিল করার ইচ্ছা পোষণ করছে বলে যদি আদালতের সন্তুষ্টি বিধান করতে পারে, তাহলে আদালত আপিল দায়েরের নিমিত্তে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জামিন দিতে পারেন এবং যতদিন আসামী জামিনে মুক্ত থাকবে ততদিন পর্যন্ত কারাদণ্ড স্থগিত রয়েছে বলে বিবেচিত হবে।
চেকের মামলায় সাজা হওয়ার পর জরিমানা বা চেকের টাকার ৫০ শতাংশ জমা না দিয়েও জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে "পূবালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম চৌধুরী শামীম হামিদ এবং অন্যান্য" ২০২৪ (৩১) এ এলআর (এডি) ৫৮ মামলাটি বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির।
এই মামলায় আসামি বিচারিক আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হন এবং সাজা ও জরিমানার আদেশ পান। মামলাটির প্রধান তর্কের বিষয় ছিল "টাকা জমা না দিয়ে কি সাজা স্থগিত বা জামিন পাওয়া সম্ভব?" এবং "টাকা জমার বিধানটি কি আসামির আপিল করার মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে?"
উচ্চ আদালত এই মামলায় এবং পরবর্তী সমজাতীয় প্রেক্ষাপট (যেমন: ৫৯ ডিএলআর ৬২৩) কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন এবং আদালত ব্যাখ্যা করেন যে, আপিল "গ্রহণ" করার জন্য ৫০ শতাংশ টাকা জমা দেওয়া একটি বিধিবদ্ধ শর্ত হলেও আসামির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা একটি ভিন্ন বিষয়।
আদালত বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ (১) ধারা অনুযায়ী আপিল আদালত সাজার কার্যকারিতা স্থগিত রাখতে পারেন এবং আসামিকে জামিন দিতে পারেন। যদি আসামি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি অত্যন্ত দরিদ্র বা টাকা জমা দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই, তবে কেবল টাকার অভাবে তাকে কারাগারে রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে। এই মামলায় উচ্চ আদালত বিবাদীর সাজা স্থগিত করে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জামিন প্রদান করেন এবং নির্দেশ দেন যে এই সময়ের মধ্যে তাকে আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এটি প্রতিষ্ঠিত করে যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে টাকা জমা দেওয়া ছাড়াও জামিন পাওয়া সম্ভব।
পূবালী ব্যাংক বনাম চৌধুরী শামীম হামিদ মামলার মূল শিক্ষা হলো- আইনি মারপ্যাঁচ এবং সঠিক গ্রাউন্ড তুলে ধরতে পারলে টাকা জমা দেওয়ার আগেই উচ্চ আদালত থেকে সাজা স্থগিত ও জামিন নেওয়া সম্ভব।
কাজেই আব্দুল মজিদ বনাম রাষ্ট্র (২০১৭) মামলায় বলা হয়েছে, ১৩৮এ ধারার বিধানটি আপিল দায়ের করার জন্য বাধ্যতামূলক, কিন্তু জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা খর্ব করে না। যদি আসামি রায়ের দিন আদালতে উপস্থিত থাকেন এবং তাৎক্ষণিক জামিন চান, আদালত আপিল করার সময় দিয়ে জামিন দিতে পারেন। কারণ, টাকা জমা দেওয়ার শর্ত আপিল করার মৌলিক অধিকারকে বাধাগ্রস্থ করে, যা সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। যদি বিচারিক আদালতের রায়ে কোনো গুরুতর আইনি ত্রুটি থাকে, তবে আসামী উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। রিট শুনানির অনেক সময় ৫০ শতাংশ টাকা জমা দেওয়ার শর্ত শিথিল বা স্থগিত করার আদেশ পাওয়া যায়।
বিচারিক আদালতে সারেন্ডার করার পর যদি আপিল আদালত জামিন না দেয়, তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা যায়। হাইকোর্ট গুণাগুণ বিচার করে টাকা জমা দেওয়া ছাড়াই অন্তর্বতীকালীন জামিন দিতে পারেন।
কাজের চেকের মামলায় ১৩৮এ ধারা এবং ফৌজদারি কার্বিধির ৪২৬ (২ক) দুটি ধারা পাশাপাশি পড়লে সুষ্পষ্ট বুঝা যায় যে, ৫০ শতাংশ টাকা জমা দেওয়াটি আপিলের শর্ত, জামিনের না। এখানে আরও একটি বিষয় হলো ফৌজদারি কার্যবিধি তৈরী হয়েছে ১৮৯৮ সালে এবং চেকের মামলায় ১৩৮এ ধারাটি সংযোজন করা হয়েছে ২০০৬ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে। ফলে পূর্বের ফৌজদারি কার্বিধির ৪২৬ (২ক) ধারায় যে জামিনের সুবিধা রয়েছে সেটি রহিত করা হয়নি। ফলে আইনের উদ্দেশ্যটি এখনও সুষ্পষ্ট।
লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।