টুকটুকে লাল পলাশ। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, গাছের শাখায় যেন আগুন জ্বলছে। বসন্তের হাওয়া লাগতেই মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের একটি গাছে ফুটেছে এই ফুল। আগুনরাঙা পলাশের রূপ জানান দিচ্ছে, এখন বসন্তের ভরা মৌসুম। গ্রীষ্মে সোনালু, বর্ষায় জারুল, শীতে কাঞ্চন আর বসন্তে পলাশ—প্রতিটি ঋতু এখানে আলাদা রূপে ধরা দেয়।
সাধারণত হলুদ, লাল ও লালচে কমলা—এই তিন রঙে দেখা যায় পলাশ। তবে লালচে কমলার আগুনরাঙা রূপই বেশি নজর কাড়ে। ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে গাছ ভরে ওঠে ফুলে। ফুল ফোটার সময় গাছ প্রায় পাতাশূন্য থাকে।
বসন্ত এলেই পাতার সবুজ ছাপিয়ে ফুটে ওঠে আগুনরাঙা ফুল। তা দেখে হঠাৎ থমকে যান পথিক, কেউ কেউ মুঠোফোনে বন্দী করেন মুহূর্তটি, কেউবা সকালবেলায় ঝরে পড়া ফুল কুড়িয়ে নেন। রোদের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পলাশের রং আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজের ভেতর জ্বলছে আগুনের লাল শিখা।
জেলার কমলগঞ্জ পৌর এলাকার উপজেলা পরিষদের দিকে যাওয়ার সময় পলাশের ছবি তুলছিলেন সাংবাদিক ও লেখক পারভেজ আহমেদ। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা। রোবাবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, শহরের অন্য সড়কগুলোর চেয়ে এই সড়কের আলাদা একটা বিশেষত্ব আছে। এখানে সব সময়ই কোনো না কোনো ফুল ফুটে থাকে। এখন বসন্তে পলাশ ফুটেছে। গাছের নিচে লাল ফুল বিছিয়ে আছে, দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।
সড়কটির পাশেই ভাড়া বাসায় বসবাস করেন মুন্নী আক্তার। তিনি বলেন, ‘ছয়-সাত বছর আগে উপজেলা পরিষদে পলাশগাছ লাগানো হয়। দুই বছর ধরে গাছগুলো ফুল দিচ্ছে। গরমের সময় গাছের নিচে বসে থাকা যায়। এখানে বসলেও একটু অন্যরকম লাগে। পলাশগাছগুলো এমনভাবে ফুটেছে যে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, বসন্ত এসেছে!’
পলাশ মাঝারি আকারের একটি পর্ণমোচী বৃক্ষ। বৈজ্ঞানিক নাম বিউটিয়া মোনোসপারমা (Butea monosperma)। গাছটি সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। ফুলের দৈর্ঘ্য সাধারণত দুই থেকে চার সেন্টিমিটার। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই পলাশ দেখা যায়। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াতেও এর বিস্তৃতি রয়েছে।
মুহূর্তটি তখন ‘আলতা সিন্দুরে রাঙা’ হয়ে আছে। হালকা ধূসর সবুজের মাঝখানে এখানে পলাশের রঙে এখন অন্য এক প্রকৃতি। এখানে পলাশের রঙেই বসন্ত এসেছে।
কমলগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলী মর্তুজা বলেন, ‘একসময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বাড়ির আঙিনা—সবখানেই পলাশ ও শিমুলগাছ দেখা যেত। কিন্তু নগরায়ণ ও আধুনিকতার চাপে গাছ কেটে ফেলা, বীজ না বপন করা এবং পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের অভাবে এসব গাছের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।
তিনি বলেন, ‘একটি এলাকার প্রকৃত সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে নানা ধরনের গাছ লাগানো প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের প্রভাবে প্রতিটি ঋতুই তার নিজস্ব বৈচিত্র হারাচ্ছে। প্রকৃতির স্বরূপ ফিরিয়ে দিতে হলে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ জরুরি—ফলজ ও বনজ গাছের পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধক গাছও লাগাতে হবে।’
এসআর