Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশ      প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় অন্তর্ভুক্তির দাবি পাইনকা সম্প্রদায়ের

প্রকাশ: রোববার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১২:০০ পিএম   (ভিজিট : ৮৪)

শ্রীমঙ্গল উপজেলার খাইছড়া চা বাগানে বসবাসরত পাইনকা সমাজের ১২টি পরিবারের ঘরের ছবি।

বাংলাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে চা চাষের সূচনা হয়। ১৮৫৪ সালে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে চা শ্রমিক হিসেবে এ অঞ্চলে আনা হয়। সেই সময় আগত জনগোষ্ঠীর মধ্যে কবীরপন্থী সম্প্রদায়ের পানিকা/পাইনকা জাতিগোষ্ঠী অন্যতম। প্রায় ১৭০ বছর ধরে তারা দেশের বিভিন্ন চা বাগানে শ্রম দিয়ে আসছে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কিন্তু সংখ্যায় কম হওয়ায় এবং সামাজিক ভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকায় এ জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মৌলিক অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পিছিয়ে রয়েছে। তারা সামাজিক ভাবে বঞ্চিত ও অর্থনৈতিক ভাবে অনগ্রসর। তবুও সরকার ঘোষিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন, ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা এবং জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আসছে।

পাইনকা জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার হার অত্যন্ত নাজুক। দারিদ্র্য, আর্থিক অক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে এ জনগোষ্ঠী এখনো দেশের মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে। সচেতনতার ঘাটতিও শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। প্রায় ১৭০ বছরের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এ জাতিগোষ্ঠীর সামগ্রিক শিক্ষার মান উদ্বেগজনক ভাবে নিম্নমুখী।

বাসস্থান: সিলেট বিভাগে
পরিবার সংখ্যা: ২৩৭টি
সদস্য সংখ্যা: প্রায় ২ হাজার
ভাষা: ছত্রিশগড়ি
প্রায় ৯৮% লোকের বসবাস চা বাগানে
ভাষা হারানোর পথে
শিক্ষার মান: নিম্নমুখী

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭০ জন। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত রয়েছে ৩০ জন শিক্ষার্থী এবং একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত রয়েছে মাত্র ১৫ জন। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এখন পর্যন্ত এ জাতিগোষ্ঠীর কেউ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করতে পারেনি। সরকারি চাকরিতেও তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। পাইনকা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমানে মাত্র দু'জন সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছেন, যারা পুলিশ বিভাগে কর্মরত।

এই জাতি প্রায় ৯৮ শতাংশ লোক চা বাগানে বসবাস করে। এদের নিজস্ব কোনো ভিটা মাটি নেই। চা কোম্পানীর সরকারের কাছ থেকে লীজকৃত জায়গার উপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে। তাদের বসবাস মূলত সিলেট বিভাগে বিস্তৃত বিভিন্ন চা বাগানে। বাংলাদেশে বর্তমানে পাইনকা জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ২৩৭টি পরিবার রয়েছে, সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।

একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত চা বাগানগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলার চা বাগানে রয়েছে ১৬৫টি পরিবার। হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন চা বাগানে বসবাস করছে ৪৯টি পরিবার এবং সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলার চা বাগানে রয়েছে ২৩টি পরিবার।

এ জাতি গোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর থেকে একটু আলাদা। এই পাইনকা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব আচার অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি খুবই আকর্ষণীয়। পাইনকা জাতিগোষ্ঠীর ভাষা মূলত 'ছত্রিশগড়ি ভাষা'। ভারতের মধ্যপ্রদেশের ছত্রিশগড়, রায়পুর, বিলাশপুর এর আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে পাইনকা পরিবারে নিজস্ব ভাষার ব্যবহার বা চর্চা খুবই কম। দিনের পর দিন এই ভাষা ও সংস্কৃতিকে অন্য জাতি গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি এসে গ্রাস করে ফেলছে।

তবে নিজস্ব সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রকৃত শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এগুলোর মূল্যবোধ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার সংরক্ষণে বর্তমান প্রজন্মের ব্যাপক উদাসীন মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

অন্যদিকে, ভাড়াটে ডিজে সংস্কৃতি এসে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে গ্রাস করে ফেলেছে। তাই এই জাতি গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন পাইনকা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দরা।

বাংলাদেশের কবীরপন্থী সম্প্রদায়ের পাইনকা জাতিগোষ্ঠীকে সরকারি ভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি উঠেছে। সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের কবীরপন্থী পাইনকা সমাজের সাধারণ সম্পাদক দুলাল পাইনকা বলেন, 'রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অংশ হিসেবে সরকারি ভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় পাইনকা জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত ও স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে।'

তিনি উল্লেখ করেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সকল জাতিগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করা যাবে। পাইনকা জাতিগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, 'সরকার ঘোষিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এ জনগোষ্ঠী কোনো ভাবেই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।'

দুলাল পাইনকা শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে কোটা সুবিধা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি চালু এবং ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে “সদগুরু কবীর উপাসনালয়” নামে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

এছাড়া, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ছত্রিশগড়ি ভাষা শিক্ষা চালু করা এবং তা জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণেরও দাবি জানান।

মৌলভীবাজার চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফোরামের প্রধান নির্বাহী পরিমল সিং বাড়াইক বলেন, 'সরকারের পূর্ববর্তী তালিকায় চা বাগানে বসবাসকারী প্রায় ১৯টি জাতিগোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায় মিলিয়ে প্রায় ৫০টি জাতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তালিকায় লিপিবদ্ধ রয়েছে।'

তিনি বলেন, 'শুধু পাইনকা জাতিই নয়, আরও অনেক জাতিগোষ্ঠী এখনো তালিকার বাইরে রয়ে গেছে।'

তার মতে, সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তালিকাভুক্তির জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা উচিত। তারা চাইলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া কী, সে বিষয়ে তিনি সহযোগিতা করবেন।

পরিমল সিং বাড়াইক বলেন, 'তিনি অতীতেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া তালিকা থেকে ১৯টি জাতিগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালে পাইনকা জাতিসহ প্রায় ২২টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা অগ্রগতি দেখা যায়নি।'

তবে পাইনকা নেতৃবৃন্দের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পাইনকা জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং মূলধারার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আরও জোরদার হবে। সব মিলিয়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পাইনকা জাতিগোষ্ঠী এখনো বহু দূর পিছিয়ে রয়েছে, যা তাদের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমএ


সম্পর্কিত   বিষয়:  মৌলভীবাজার   শ্রীমঙ্গল  


LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close