আমাদের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নানা উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। নীতির ভাষ্য বদলেছে। স্লোগানের রং পাল্টেছে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশ বহু পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে- আশার উন্মেষ দেখেছে, হতাশার অন্ধকারও দেখেছে।
কখনো গণতন্ত্রের উচ্ছ্বাস, কখনো অবিশ্বাসের দীর্ঘ ছায়া; কখনো উন্নয়নের অগ্রযাত্রা, কখনো বিতর্কের ভার।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে একটি প্রশ্ন বার বার ফিরে এসেছে- আমাদের রাজনীতি কি সত্যিই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে? রাষ্ট্র কি নাগরিকের কাছে সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, না কি প্রভুত্বের কাঠামো হিসেবেই রয়ে গেছে? সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল- কথার চেয়ে কাজ, প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রমাণ, ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব।
এই দীর্ঘ প্রত্যাশার মধ্যেই নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো নতুন এক আলোর রেখা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ক্ষমতায় আসার পর তার আচরণ, সিদ্ধান্ত ও বার্তায় একটি গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
কারণ রাজনীতির প্রকৃত রূপান্তর কেবল নীতিপত্রে নয়- এটি প্রতিফলিত হয় জীবনাচারে, দায়িত্ববোধে, নেতৃত্বের দৈনন্দিন আচরণে।
একটি জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেকাংশে নির্ধারিত হয় তার শীর্ষ নেতৃত্বের চরিত্র ও কর্মদর্শনে। নেতৃত্ব যদি সরলতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তবে তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। আর যদি ক্ষমতার প্রদর্শনই হয়ে ওঠে রাজনীতির মুখ্য ভাষা, তবে রাষ্ট্রের ভেতরে দূরত্ব ও অনাস্থা জন্ম নেয়।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মানুষের প্রত্যাশা আর কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়; তারা দেখতে চায় নৈতিকতার পুনর্জাগরণ, সুশাসনের দৃশ্যমান চর্চা এবং মানবিক রাষ্ট্র চিন্তার বাস্তব প্রয়োগ। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একটি সরকারের সূচনা নয়- সম্ভাব্য এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনাও হতে পারে।
ক্ষমতারোহনের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন- বিএনপি'র সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না, সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। বাংলাদেশে উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের জন্য এসব সুবিধা যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রথায় পরিণত হয়েছিল। সেই প্রথার বাইরে এসে নিজেরাই বিশেষ সুবিধা প্রত্যাখ্যান করা নিছক ব্যক্তিগত বা দলীয় সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। একইসঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বহরের গাড়ির সংখ্যা কমিয়েছেন, নিরাপত্তা প্রটোকল সীমিত করেছেন।
সাধারণ মানুষ যখন প্রতিদিন যানজটে ভোগে, তখন শাসকের দীর্ঘ বহর সড়ক বন্ধ করে দিলে দূরত্ব তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় বহর কমানো মানে শুধু ব্যয় সাশ্রয় নয় বরং এটি ক্ষমতার অহংকার কমিয়ে নাগরিকের কাছে আসার চেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।
সকাল ৯টায় নিজ দপ্তরে উপস্থিত হয়ে কাজ শুরু করা- এটিও আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে সময়ানুবর্তিতা প্রায়ই উপেক্ষিত। প্রধানমন্ত্রী নিজে যদি নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হন, শনিবার ছুটির দিনেও কাজ করেন, তবে সেটি একটি সাংগঠনিক বার্তা বহন করে- রাষ্ট্র পরিচালনা একটি পূর্ণকালীন দায়িত্ব, আনুষ্ঠানিকতা নয়।
একটি দেশের কর্মসংস্কৃতি অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় তার শীর্ষ নেতৃত্বের আচরণ দ্বারা। মানুষ যা দেখে, তাই অনুকরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর সাদামাঠা পোশাক, অনাড়ম্বরতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরলতা ও জবাবদিহিতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রথম ভাষণেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্নীতি বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর একটি গভীর সমস্যায় পরিণত হয়েছে- যা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না বরং নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। প্রধানমন্ত্রী যখন জাতির উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দেন যেকোনো অবস্থাতেই দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না, তখন সেটি প্রশাসন, রাজনীতি ও ব্যবসায়ীক মহলে একটি স্পষ্ট সংকেত পৌঁছে দেয়। তবে বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। যদি কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য বজায় থাকে, তবে এই ঘোষণাই হতে পারে প্রশাসনিক সংস্কারের ভিত্তি।
নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বিরোধী দলীয় নেতাদের বাসায় গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃশ্য। আমাদের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই বৈরিতায় রূপ নেয়। সেখানে বিজয়ী নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী নিজে এগিয়ে গিয়ে সংলাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। গণতন্ত্র মানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়; এটি মতভেদের সহাবস্থান। বিরোধী মতকে সম্মান জানানোই একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ।
২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর থেকে তার প্রতিটি পদক্ষেপে বিনয়ের প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে প্রথম দিন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরানো কর্মচারীকে নাম ধরে ডাকা- এটি নিছক আবেগঘন মুহূর্ত নয় বরং এটি তার মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১০ জানুয়ারি হোটেল শেরাটনে সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এক সাংবাদিক তাকে 'মাননীয়' সম্বোধন করলে তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে অনুরোধ করেন- এভাবে সম্বোধন না করতে। এর মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার দম্ভকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
অনেকে তারেক রহমানের আচরণের সঙ্গে তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তুলনা করছেন। জিয়াউর রহমানের সরলতা, শৃঙ্খলা ও কর্মমুখী নেতৃত্বের কথা এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় দারুণ ভাবে প্রাসঙ্গিক। একই ভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দীর্ঘদিন গণমানুষের সমর্থন পেয়েছেন।
একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার কেবল নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধে প্রতিফলিত হয়। যদি সেই উত্তরাধিকার বিনয়, সংযম ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তবে তা ইতিবাচক ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে।
এক-এগারো সরকারের সময় তার ওপর যে কঠিন নির্যাতন নেমে এসেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়। সেই অভিজ্ঞতার পরও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কটু ভাষা ব্যবহার না করা, সংযম বজায় রাখা- এটি কোন সাধারণ ঘটনা নয়।
এ বিষয়টি সত্যিকার অর্থে তারেক রহমানকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সহনশীলতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় গুণগত পরিবর্তনের প্রকৃত সূচনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষেই তিনি যথার্থ রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠেছেন। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বনানীতে প্রাণীদের জন্য একটি হাসপাতাল উদ্বোধন করেছেন। রাষ্ট্রের মানবিকতা কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণিকূলের প্রতিও দায়িত্বশীলতা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।
একটি মানবিক রাষ্ট্র মানে- আইনের শাসন থাকবে, কিন্তু তা হবে সহানুভূতিশীল; উন্নয়ন হবে, কিন্তু তা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক; অর্থনীতি বাড়ব, কিন্তু তা হবে বৈষম্যহীন।
ইতিহাস বলে- বক্তৃতা মানুষের কানে পৌঁছায়, কিন্তু আচরণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়। রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিগত জীবনযাপন, সময়ানুবর্তিতা, বিনয়, দায়িত্বশীলতা- এসবই নাগরিকদের জন্য নীরব পাঠ্যপুস্তক।
যদি শীর্ষ নেতৃত্ব দেখায় যে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণের জন্য- তবে প্রশাসনের নিচের স্তরেও সেই বার্তা পৌঁছায়। গুণগত পরিবর্তন মানে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি নৈতিকতার পুনর্গঠন।
তাঁর ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে একটি বিশ্ব মানের রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। বিশ্ব মানের রাষ্ট্র মানে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার, আইনের সমতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব।
যদি ঘোষিত রূপরেখা বাস্তবায়নে তিনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দায়িত্বশীল, আত্ম মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে আরও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে এসব বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ- সবই সামনে রয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনের শুরু যদি শীর্ষ থেকে হয়, তবে তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে। এতে আমার নূন্যতম সন্দেহ নেই।
এখানে এই সত্যও স্বীকার করতে হবে যে গুণগত পরিবর্তন রাতারাতি আসে না; এটি ধারাবাহিকতার ফল। প্রধানমন্ত্রী যদি ব্যক্তিগত আচরণের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যুক্ত করতে পারেন- দুর্নীতি দমন, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি- তবে সেই পরিবর্তন অবশ্যই টেকসই হবে।
অনেকদিন পর বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে গিয়েছিলাম। সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল নতুন সরকারের কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ, ভাবভঙ্গি ও চলনবলন স্বচক্ষে দেখা। প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখলাম। লক্ষ্যণীয় বিষয়- সবখানেই এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের ছাপ। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে এক ধরনের সংযম-সচেতনতা অনুভব করলাম। মনে হলো, শীর্ষ নেতৃত্বের যে বিনয়, সৌজন্য ও নিয়মানুবর্তিতা জাতি ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে, তার কিছুটা প্রভাব প্রশাসনের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন এক ধরনের প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছেন। নেতৃত্ব যখন নিজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তখন তার প্রভাব নিচের স্তরেও পড়ে- এটাই স্বাভাবিক।
একটি প্রবাদ আছে- 'মর্নিং শোজ দ্য ডে।' অর্থাৎ দিনটা কেমন যাবে সকালেই তার ইঙ্গিত মেলে। শুরুটা যদি শৃঙ্খলা, বিনয় ও দায়িত্ববোধ দিয়ে হয়, তবে ভবিষ্যৎ পথচলার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া যায়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নের উত্তরাধিকার বহন করছেন তারেক রহমান। মানুষের প্রত্যাশা—তিনি সেই স্বপ্নকে আধুনিক বাস্তবতায় রূপ দেবেন। ইতোমধ্যে তারেক রহমানের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে, আস্থাও বেড়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ক্ষমতার প্রদর্শনী দেখেছে। এখন সময় এসেছে দায়িত্ববোধ প্রদর্শনের। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে যে বার্তা দিচ্ছেন- তা যদি ধারাবাহিক থাকে, তবে রাজনীতি ও রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থেই গুণগত পরিবর্তনের পথে এগোতে পারে।
সুতরাং এখন আমাদের সকলের দায়িত্ব হচ্ছে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি না করে যার যার অবস্থান থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অকুন্ঠ সহযোগিতা ও সমর্থন অব্যাহত রাখা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com