Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশ      প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      

বরিশালে বার ও বেঞ্চ: এক রথের দুই চাকা যখন মুখোমুখি!

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৩৩ পিএম   (ভিজিট : ১৪৭)
বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের জামিন আদেশকে কেন্দ্র করে বরিশাল বার ও বেঞ্চের মধ্যে শুরু হয়েছে বিচারিক দাপট বনাম পেশাদারিত্বের মর্যাদার লড়াই। চলছে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা-সমালোচনা। 

মহামান্য হাইকোর্ট থেকে শুরু করে চৌকি আদালত পর্যন্ত। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ফেসবুক, পত্রিকা এবং টকশো পর্যন্ত। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত চলছে, চলবে।

বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়ত উল্লাহ’র অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিন দেয়ায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা এজলাস কক্ষে প্রবেশ করে টেবিল চেয়ার ফেলে দিয়ে আদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, বিচার কার্যক্রম চলা অবস্থায় কয়েকজন আইনজীবী উত্তেজিত অবস্থায় আদালত কক্ষে ঢুকে বিচারকের দিকে আঙুল তুলে নানা কথা বলছেন। এ ঘটনায় আদালতের বেঞ্চ সহকারী বাদী হয়ে দ্রুত বিচার আইনে ১২ জন আইনজীবীর নাম উল্লেখ করে আরও ১৫ থেকে ২০ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করায় ইতোমধ্যে আইনজীবী সমিতির সভাপতি আদালতের চেম্বার থেকে পেশাগত অবস্থায় পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্য আসামিরা গ্রেপ্তার এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছেন। আদালতের আইনজীবীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালত বর্জন করেছেন। 

এদিকে, মহামান্য হাইকোর্টও জড়িত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন।

এ কথা বলায় যায় যে, বরিশালে আইনজীবী-বিচারক দ্বন্দ্বে জিম্মি পুরো ন্যায় বিচার। হাতকড়া যখন আইনজীবীর হাতে, বিচার ব্যবস্থার ভাবমূর্তি তখন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। বার কাউন্সিলকে না জানিয়ে সরাসরি পুলিশ পাঠিয়ে গ্রেপ্তার করানো অনেক সময় বার ও বেঞ্চের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী দূরত্ব তৈরি করে, যা বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ রকম প্রেক্ষাপট সাধারণ বিচারপ্রার্থীর মধ্যে বিচার বিভাগ সম্পর্কে রীতিমত নেতিবাচক ম্যাসেজ দেয়।

সাধারণ মানুষ বিচারককে দেখে একজন ধীরস্থির, ধৈর্যশীল এবং ন্যায় বিচারক হিসেবে। কিন্তু সরাসরি পুলিশ পাঠিয়ে গ্রেপ্তার করানোর ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা দেয় যে, বিচারকও হয়তো সাধারণ মানুষের মতো আবেগপ্রসূত বা প্রতিশোধ পরায়ণ হতে পারেন। এতে বিচারকের 'নিরপেক্ষতা' প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বিচারালয় হওয়ার কথা ন্যায় বিচারের আশ্রয়স্থল। কিন্তু বিচারক ও আইনজীবীর মধ্যে এমন মারমুখী সম্পর্ক দেখলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা ভাবতে শুরু করেন 'যদি একজন আইনজীবীরই এই অবস্থা হয়, তবে আমার মতো সাধারণ মানুষের কী হবে?' এটি আদালতের প্রতি মানুষের আস্থাকে দূর্বল করে। পাশাপাশি জনমনে এই বার্তা যায় যে, আদালত প্রাঙ্গণ এখন আর আইনি তর্কের জায়গা নেই, বরং এটি ক্ষমতার দাপট দেখানোর জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা আইনের শাসনের চেয়ে 'বিচারকের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি'কে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন, যা বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত।

আরেকটি বিষয় বলে রাখা দরকার যে, আইনজীবী হলেন বিচারপ্রার্থীর একমাত্র সহায়। যখন সেই আইনজীবীকে হাতকড়া পরা অবস্থায় পুলিশ নিয়ে যায়, তখন মক্কেল বা বিচারপ্রার্থী তার আইনজীবীর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তারা মনে করেন, যার নিজেরই নিরাপত্তা নেই, তিনি আমাকে কীভাবে আইনি সুরক্ষা দেবেন?

উচ্চতর আদালত সবসময় বলে এসেছেন যে, 'বিচারকদের কাঁধ হতে হবে অনেক চওড়া এবং ধৈর্য হতে হবে অসীম। আদালতের মর্যাদা এবং ক্ষমতা বিচারকের ব্যক্তিগত ইগো রক্ষার জন্য নয়, বরং আদালতের ওপর জনগণের বিশ্বাস রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হওয়া উচিত।'

একজন বিচক্ষণ বিচারক এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক উত্তেজিত না হয়ে বিকল্প ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারতেন। যেমন- আইনজীবীকে সতর্ক করা, আইনজীবীর লাইসেন্স বাতিলের জন্য বার কাউন্সিলে রেফারেন্স পাঠানো, মহামান্য হাইকোর্টকে জানানো ইত্যাদি যাতে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা না যায়।

সরাসরি পুলিশি ব্যবস্থা অনেক সময় ন্যায় বিচারের চেয়ে 'বিচারিক আধিপত্য' হিসেবে বেশি প্রকাশিত হয়। এটি সাধারণ মানুষকে আদালত থেকে মানসিক ভাবে দূরে সরিয়ে দেয়। উচ্চতর আদালত বিভিন্ন সময় বলেছে যে, বিচারকদের আচরণ হতে হবে পাহাড়ের মতো অটল এবং সমুদ্রের মতো শান্ত। একজন আইনজীবী উত্তেজিত হলেও বিচারককে তার পদের মর্যাদা রক্ষায় শান্ত থাকতে হবে। 

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভিন্ন রায়ে বলেছেন, 'আইনজীবী ও বিচারক একই রথের দুটি চাকা। যদি একটি চাকা অন্যটিকে আঘাত করে, তবে ন্যায় বিচারের সেই রথটি থেমে যাবে, যার পরিণতি ভোগ করতে হবে অসহায় সাধারণ মানুষকে।'

এবার আসি আইনগত প্রশ্নে। বিরোধ তো সৃষ্টি হয়েছে জামিন দেয়াকে কেন্দ্র করে। জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন পাওয়া আসামির আইনগত অধিকার। এখানে আদালতের নিজস্ব বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে উচ্চতর আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, বিচারককে আইনের অক্ষরের চেয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। জনস্বার্থ এবং সামাজিক নিরাপত্তার খাতিরে আদালত এমন নির্দেশনা দিতে পারেন যা প্রচলিত প্রথার ঊর্ধ্বে গিয়ে সমাজকে সুরক্ষা দেয়।

উচ্চ আদালত সবসময় একটি ভারসাম্য রক্ষার কথা বলে। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যক্তিগত স্বাধীনতা যেমন- মৌলিক অধিকার, তেমনি জনশৃঙ্খলার স্বার্থে তার ওপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়।
আবার ওই বিচারকের বিরুদ্ধে যদি ঘুষ নিয়ে জামিন দেয়ার অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটাও ভিন্ন ভাবে সমাধান করা যেত।

উচ্চতর আদালতের মতে, বিচারকের আসনটি একটি 'পবিত্র আমানত'। দুর্নীতির মাধ্যমে জামিন দেওয়া কেবল অপরাধ নয়, বরং এটি বিচারিক অসদাচরণ। ৫৭ ডিএলআর হাইকোর্ট বিভাগ বনাম বিচারপতি মো. শহিদুর রহমান মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে, বিচারকের নৈতিকতা ও সততা নিয়ে সামান্যতম প্রশ্ন উঠলে তিনি বিচার কাজ করার যোগ্যতা হারান। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে অপসারণ করা অপরিহার্য।

বিচারক হলেও তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে বিচারকের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা হতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ (এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা) অনুযায়ী, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তদন্ত সাপেক্ষে তাকে অপসারণের ব্যবস্থা রয়েছে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের জিএ কমিটি বিভাগীয় মামলা ও চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেয়।

অসংখ্য মৌলিক আইনগ্রন্থের প্রণেতা মরহুম গাজী শামসুর রহমান বলেছিলেন, কোনো মানুষ ভ্রমের ঊর্ধ্বে নয়, সম্ভবত বিচারকও নয়। বিচারকের ভ্রম ধরিয়ে দিতে পারে শুধু সেই ব্যক্তি যিনি জ্ঞানে, গুণে, মর্যাদায় এবং অবস্থানে বিচারকের সমকক্ষ। সেই ব্যক্তিই অ্যাডভোকেট।

পাঠক নিশ্চয়ই মনে আছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল অতিরিক্ত বিচারকের পদ থেকে শাহিদুর রহমানকে সরিয়ে দেন। ২০০৩ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান সৈয়দ শাহিদুর রহমান। ওই বছরের অক্টোবরে নাসিম সুলতানা কনা নামের এক নারী ‘ঘুষের বিনিময়ে জামিন’ করানো সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আনেন সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন করে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন। 

কাউন্সিল অভিযোগ তদন্ত করে জানান, বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়নি। যেহেতু অভিযোগটি গুরুতর সেহেতু অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে শাহিদুর রহমানের দায়িত্ব পালন করা উচিত নয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৬(৬) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে শাহিদুর রহমানকে অতিরিক্ত বিচারকের পদ থেকে অপসারণ করেন। এ অপসারণ আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন শাহিদুর। ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ০২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রাষ্ট্রপতির অপসারণ আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। পরে এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল হয়। আপিল আদালত ওই বিচারক আর বিচারক পদে ফিরতে পারবেন না বলে রায় দেন।

অবশেষে ছোট্ট একটি বাক্য দিয়েই লেখাটি শেষ করলাম। সংঘাত নয়, প্রয়োজন সমন্বয়। বার ও বেঞ্চের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংকট এড়াতে এবং বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় একটি গাইডলাইন খুবই জরুরি।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। 
ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com

এমএ




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close