বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মেরামত ও সংস্কার খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কেন্দ্র মেরামতের নামে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজস্ব খাতের আওতায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্র মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য উপজেলার ২৫ টি বিদ্যালয়ে ১.৫ লক্ষ টাকা থেকে সর্বনিন্ম ২৬ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। এই টাকায় রুমে লাইট এবং বাথরুমে পানির লাইন ঠিক করা এবং কোথাও কোথাও ফ্লোরের ফাটা প্লাস্টার ঠিক করে পুরো টাকা পকেট বন্দী করা হয়েছে এবং একটা পার্সেন্ট শিক্ষা কর্মকর্তার পকেট বন্দী হয়েছে। চার পাচটি স্কুলের বরাদ্দ থাকলেও সেখানে নির্বাচনী কেন্দ্র না থাকায় টাকা পৌঁছায়নি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিষয়টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করার কথা বললেও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
রেলওয়ে কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৩ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হলে সেখানে কোন কেন্দ্র ছিল না, যদু ফকির পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ লক্ষ টাকা ব্যয় ধরা হলেও সেখানে কোন কেন্দ্র না থাকায় কোন টাকা দেওয়া হয়নি।
তাছাড়া তেনা পঁচা কাজী মোনাক্কা বেগম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কে কে এস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেবগ্রাম কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুদু খান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর বালিয়া কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাকলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অধিকাংশ বিদ্যালয়ে রয়েছে পাকা সুসজ্জিত ভবন তাছাড়া কিছু বিদ্যালয়ে রয়েছে চমৎকার ওয়াসব্লক। তারপরও এ সমস্ত স্কুলগুলোতে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মূলত লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
সংস্কার ও মেরামতের জন্য বরাদ্দ অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন ও মুঠোফোনে প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে এসি/ডিসি বাল্ব, কয়েকটি রড লাইট ও কোন কোন স্কুলে প্লাষ্টার, পানি যাওয়ার পাইপের খরচ করে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকার ব্যয় করা হয়েছে। অথচ বেশির ভাগ স্কুলের পাকা ভবন, সাথে ওয়াসব্লক রয়েছে সেখানে নাম মাত্র কয়েকটি বাল্ব কিনে পুরো টাকা প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তার পকেটে চলে গেছে।
পক্ষান্তরে উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সংস্কার উপযোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ কেন্দ্রের নাম এ তালিকায় নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁর অনুগত ও বিশ্বস্ত প্রধান শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান ছাড়া এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়া হয় না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে সারাদেশের ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৪১ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে একই বিদ্যালয়গুলোতে দ্বিগুণ বরাদ্দ দিয়ে আরও ৮২ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৪২ টাকা প্রদান করা হয়। এর অংশ হিসেবে জেলার ১৩৫টি বিদ্যালয়ের কেন্দ্র মেরামতের জন্য দুই ধাপে ১ কোটি ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৭ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়।
এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৩৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ১৮ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। বালিয়াকান্দিতে ৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুকূলে প্রথম ধাপে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬৪ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে একই বিদ্যালয়গুলোতে আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৬ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই ধাপে মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। গড়ে প্রতিটি বিদ্যালয় ৪০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ পায়।
বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যালয় ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ, দরজা-জানালা, বেঞ্চ-ডেস্ক, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ও পানির লাইনের জরুরি সংস্কার করার কথা থাকলেও অনুসন্ধানে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। অনেক বিদ্যালয়ে কোনো জরুরি সংস্কার প্রয়োজন না থাকায় বিধিলঙ্ঘন করে নতুন নতুন মালামাল কেনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার করে শিক্ষা কর্মকর্তার নিকট থেকে অনুমোদন নিয়ে বিল তুলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন এরই মধ্যে শিক্ষা কর্মকর্তা ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে অনুমোদনের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ বিদ্যালয়গুলো তাদের কেনাকাটার মধ্যে এলইডি বাল্প, সিটকিনি, হ্যাজবোল্ড, হারপিক, বালতি, ইলেক্ট্রনিক ফিটিংস, বৈদ্যতিক তার, ইট, বালু, সিমেন্ট ও মাটিসহ বিভিন্ন জিনিস ক্রয়, জানালা-দরজা মেরামত, টয়লেট পরিষ্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। যা গত স্লিপ ফান্ড থেকে তারা এগুলো ক্রয় করেছিলেন বলে একাধিক শিক্ষক নাম গোপন রেখে নিশ্চিত করেছেন।
গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান খান বলেন, একাউন্টে কিছু টাকা দিতে হয়। এজন্য ৫% টাকা নেওয়ার কথা শিকার করেন। তবে এর বেশি কেউ দেয়নি বলে জানান। কয়েকটি স্কুলের কাজ নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন বলে জানান। এছাড়া তিনটি স্কুল যেখানে কেন্দ্র নাই অথচ লিস্টে নাম আছে সেই টাকা তিনি এখনো তুলেন নাই বলে জানান। সেই টাকা তিনি রেখে দিয়েছেন সামনে ইউপি নির্বাচনে খরচ করবেন। বিষয়টি তিনি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করার কথা বলেন।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তবিবুর রহমান লিস্টে নাম আছে অথচ কেন্দ্র ছিল না এমন বিষয় জানেন না বলে জানান। এছাড়া এই টাকা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে এসেছে এবং তার নিকট থেকেই খরচ হবে জানান। কোন স্কুলে কেন্দ্র না থাকলে সেই স্কুলের টাকা ফেরত দিতে হবে। এ টাকা রাখা যাবে না। এছাড়া অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
এসআর