লেবুর রাজ্য হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলে হঠাৎ করেই লেবুর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। পাহাড়ি টিলা ও উঁচু জমিতে উৎপাদিত সুগন্ধি ও রসালো লেবুর জন্য এই অঞ্চল দেশের বিভিন্ন জেলায় সুপরিচিত। তবে মৌসুম শেষে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সরবরাহ সংকটের কারণে বর্তমানে বাজারে তীব্র মূল্যচাপ সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সারাদেশে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বর্তমানে ১,২৩৫ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ রয়েছে। গড়ে প্রতি হেক্টরে বছরে ৯–১০ মেট্রিক টন লেবু উৎপাদিত হয়। মোট উৎপাদনের প্রায় ৮০% মৌসুমে এবং বাকি ২০% অফ-সিজনে পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৭,৫০০ মেট্রিক টন লেবু উৎপাদন হয়েছে।
কয়েকদিন আগেও যেখানে প্রতি হালি লেবু ৪০–৫০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে সাইজভেদে দাম দাঁড়িয়েছে ৬০–১৫০ টাকায়। বড় সাইজ: ১০০–১৫০ টাকা, মাঝারি সাইজ: ৮০–১০০ টাকা, ছোট সাইজ: ৬০–৮০ টাকা।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
তবে লেবুচাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রমজান উপলক্ষে দাম বাড়ানো হয়নি; বরং মৌসুম শেষ হওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়া মূল কারণ। সাধারণত বর্ষাকাল লেবুর প্রধান মৌসুম। এ সময়ে উৎপাদন বেশি এবং দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকে। শুষ্ক মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই ফলন কমে যায়।
পাইকারি ক্রেতা জহির মিয়া বলেন, সরবরাহ কম থাকলেও পাইকারের সংখ্যা বেড়েছে। তিনি বলেন, “আজ ২ হাজার পিস লেবু কিনেছি। গাড়িভাড়া যোগ করলে প্রতি লেবুর দাম পড়ছে প্রায় ১৮ টাকা।”
আবাদ: ১,২৩৫ হেক্টর
প্রতি হেক্টরে উৎপাদন: ৯–১০ মেট্রিক টন
মৌসুম ভিত্তিক উৎপাদন: ৮০% মৌসুমে, ২০% অফ-সিজনে
চলতি মৌসুমে মোট উৎপাদন: প্রায় ৭,৫০০ মেট্রিক টন
স্থানীয় ক্রেতারা জানান, রমজান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামের পাশাপাশি লেবুর দামও বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মাধ্যমে মনিটরিং আরও জোরদার করা হোক।
কৃষি উদ্যোক্তা মো. আতর আলী বলেন, বর্তমানে লেবুর উৎপাদন কম থাকায় বাজারে এর দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে প্রতি ঠেলা লেবু (৮০০ পিস) ১৭–১৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ঠেলায় তিনটি ভিন্ন সাইজের লেবু থাকে। এ সময়ে চাহিদা বেশি এবং উৎপাদন কম থাকায় লেবুর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি রয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন জানান, “শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বর্তমানে ১,২৩৫ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। গড়ে প্রতি হেক্টর জমিতে বছরে ৯–১০ মেট্রিক টন লেবু উৎপাদিত হয়। মোট উৎপাদনের প্রায় ৮০% মৌসুমে হয়, আর বাকি ২০% উৎপাদন হয় অফ-সিজনে।”
তিনি আরও বলেন, “চলতি মৌসুমে প্রায় ৭,৫০০ মেট্রিক টন লেবু উৎপাদন হয়েছে। তবে বর্তমানে খরা ও পানি সংকটের কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। উৎপাদন হ্রাস এবং পবিত্র রমজান মাসে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে লেবুর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি রয়েছে।”
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “এখন লেবুর মৌসুম নয়। বর্তমানে যে লেবু পাওয়া যাচ্ছে, তাতে রসও কম। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। বৃষ্টি শুরু হলে উৎপাদন বাড়বে এবং বাজার স্বাভাবিক হবে।”
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রীমঙ্গলের লেবু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হওয়ায় এখানকার উৎপাদন ঘাটতি সরাসরি জাতীয় বাজারে প্রভাব ফেলে। মৌসুমী উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীলতা, সেচব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি মূল্য অস্থিরতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বৃষ্টি শুরু হলে ফলন বাড়বে এমন প্রত্যাশা থাকলেও, ততদিন পর্যন্ত বাজারে মূল্যচাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আরএ/আরএন