সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ এবং নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথবাক্য পাঠ করেন। সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ও আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
বিএনপি ও সালাহউদ্দিন আহমদ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন।
এর আগে সকালে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ সালাহউদ্দিন আহমদ।
১৯৯৬ সালে (ষষ্ঠ) প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল্লাহ আল ফারুখকে ৯৫ হাজার ৮৩০ ভোটের বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। দেশের পর্যটনসমৃদ্ধ জেলা কক্সবাজারের দুই উপজেলা চকরিয়া ও পেকুয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-১ আসন থেকে তিনি এর আগে ১৯৯৬ (সপ্তম) ও ২০০১ সালেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন হলে তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন এবং সেই সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনিই প্রথম কক্সবাজার জেলা থেকে প্রতিমন্ত্রীত্ব পান।
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের তৎকালীন চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদারপাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতা বেগম আয়েশা হকের পরিবারে সালাহউদ্দিন আহমদের জন্ম। আনুষ্ঠানিক শপথের মাধ্যমে তিনিই হবেন মুক্তিযুদ্ধের পর কক্সবাজার থেকে দায়িত্ব পাওয়া প্রথম পূর্ণমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী ছিলেন কক্সবাজারের সন্তান ফরিদ আহমদ। তিনি বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাবেক দুই সংসদ সদস্য খালেকুজ্জামান ও সহীদুজ্জামানের পিতা।
শিক্ষাজীবনে মেধাবী সালাহউদ্দিনের সংগ্রাম-সাফল্যে বর্ণাঢ্য পথচলা
১৯৭৭ সালে পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সালাহউদ্দিন আহমদ। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে এইচএসসিতেও দারুণ ফলাফল করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবং কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৮৫ সালের ৭ম বিসিএস (প্রশাসন) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে বদলি হয়ে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিযুক্ত হন।
পরবর্তীতে আপোষহীন নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সান্নিধ্য পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯৬ সালে চাকরি ছেড়ে আহ্বায়ক হিসেবে কক্সবাজার জেলা বিএনপির হাল ধরেন এবং একই বছরে পরপর দুটি সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
কাউন্সিলে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে পরপর দুইবার কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন।
২০১৫ সালে দেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ওই বছরের ১০ মার্চ গুমের শিকার হন সালাহউদ্দিন আহমদ। দীর্ঘ ৬২ দিন পর ১১ মে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় ভারতের শিলংয়ে তার খোঁজ পাওয়া যায়। ভারতের শিলংয়ে অবস্থানকালে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
শিলংয়ের কারাগারে বন্দিজীবন ও নির্বাসনে থেকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে প্রায় ১০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট নিজ মাতৃভূমিতে সালাহউদ্দ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় নিজের শেষ নির্বাচনী সভায় সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘আমার বেঁচে থাকার কথা ছিল না। আমাকে গুম করা হয়েছিল হত্যার উদ্দেশ্যে। আপনারা দোয়া করেছেন, রাব্বুল আলামিন আপনাদের মোনাজাত শুনেছেন এবং আমাকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমার এই নতুন জীবন, এই বর্ধিত হায়াত এ দেশের মানুষের সেবা করার জন্য। আমার জন্ম হয়েছে এ দেশের উন্নয়নের জন্য, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য।’
কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী বলেন, ‘পুরো জেলাবাসীর জন্য আজ গৌরবের দিন। আমরা একজন যোগ্য মানুষকে মন্ত্রী হিসেবে পেতে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, পুরো দেশের সঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদের যোগ্য নেতৃত্বে আরও সমৃদ্ধ হবে আমাদের কক্সবাজার।’
উল্লেখ্য, ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক সালাহউদ্দিন আহমদ। তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এসইউ/আরএন