এক সময় উত্তরবঙ্গে প্রচলিত ছিল—‘রংপুর যার, লাঙ্গল তার’। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাত ধরে রংপুরসহ পুরো উত্তরাঞ্চল জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই দুর্গেই এখন বড় ধাক্কা খেয়েছে দলটি। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল বলছে, লাঙ্গলের সোনালি দিন অনেকটাই অতীত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, সংসদীয় আসন ২ এ জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিছুল ইসলাম মন্ডল পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৯৩০ ভোট। যেখানে একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। সংসদীয় আসন-৩ এ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের লাঙ্গল প্রতীকে পান ৪৩ হাজার ৭৯০ ভোট। যেখানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর মহানগরের সাবেক আমির মাহবুবুর রহমান বেলাল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদীয় আসন ৪-এ জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান পান ৩৩ হাজার ৬৬৪ ভোট। এই আসনেই জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদীয় আসন ৫-এ জাতীয় পার্টির প্রার্থী এসএম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর পেয়েছেন ১৬ হাজার ৪৯০ ভোট। যেখানে জামায়াতে ইসলামীর রংপুর জেলা আমির অধ্যাপক গোলাম রব্বানী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। সংসদীয় আসন ৬-এ জাতীয় পার্টির নুর আলম মিয়া ভোট পান ১ হাজার ২৮৭ টি। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মো. নুরুল আমিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট।
নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, ৫টি আসনের ৪টিতেই জামানত হারাচ্ছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। ফলাফলের এই ব্যবধান জাতীয় পার্টির সংগঠন ও ভোট ব্যাংকের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে নির্বাচনী প্রচারণার সময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বারবার আ.লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও হ্যাঁ ভোটের বিরোধিতাকে আ.লীগের ভোট লাভের কৌশল মনে করা হলেও সেগুড়েও বালি। জাতীয় পার্টির ঘাটি খ্যাঁত রংপুর ৩ আসনেই জামানত হারিয়ে হয়েছে তার ভূমিধ্বস পরাজয়।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও দলটির পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। যে রংপুর-৩ (সদর) আসন থেকে এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে বিজয়ী হয়েছেন, সেই আসনেও এবার দলীয় প্রার্থীকে জয় পেতে বেগ পেতে হয়েছে। বেশ কয়েকটি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার মতো জেলাগুলোতে, যেখানে একসময় লাঙ্গল ছিল প্রথম পছন্দ, সেখানে এখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলো শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, এরশাদের মৃত্যুর পর দলীয় নেতৃত্বে বিভাজনই এই ভরাডুবির অন্যতম কারণ। জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, মশিউর রহমান রাঙার রাজনৈতিক দ্বিচারিতা দলটিকে কার্যত দ্বিধাবিভক্ত করেছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাংগঠনিক কাঠামোতে।
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতি করায় জাতীয় পার্টি তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে ভোটারদের মধ্যে। ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ তকমা দলটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করেন অনেকে। একই সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের ঢাকা কেন্দ্রিক রাজনীতি এবং মাঠপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সাধারণ ভোটারদের বিকল্প নেতৃত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তরুণ ভোটারদের মধ্যেও জাতীয় পার্টির প্রতি আগ্রহ কমেছে। তাদের মতে, অতীতের উন্নয়ন স্মৃতি নয়, বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ ভিশনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লাঙ্গলের রাজনীতিতে নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দেখতে পাচ্ছেন না তারা।
একসময় উত্তরবঙ্গের আসনগুলো অন্যান্য বড় দলের জন্য ছিল প্রায় অপ্রবেশযোগ্য। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো সংগঠন শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন।
রংপুর জেলা সুজন সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, “রংপুরের মানুষ আবেগ দিয়ে লাঙ্গলকে ভালোবাসত। হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ থেকে শাদ এরশাদ পর্যন্ত মানুষের একটা আশা ছিল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে। কিন্তু সেই আশার প্রতিফলন কখনই জাতীয় পার্টি করেনি। এছাড়াও চেয়ারম্যান পদ নিয়ে কোন্দল, মহাসচিব নিয়ে ঝামেলা, ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দও জনগণের কাছাকাছি থাকতে পারেনি। সর্বোপরি তারা রাজনৈতিক কৌশলকে জামায়াতের মতো এগিয়ে নিতে পারেনি। তারা কেবল ক্ষমতার আঁকড়ে থাকার রাজনীতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ফলে রংপুরের মানুষ ব্যালটে তাদের জবাব দিয়েছে।’’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ ছাড়া জাতীয় পার্টির সামনে টিকে থাকার পথ সহজ নয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উত্তরাধিকার ধরে রাখতে হলে দলটিকে নতুনভাবে জনগণের আস্থা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে—নইলে ‘অভেদ্য দুর্গ’ হারানোর এই ধাক্কা আরও গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে।
এসআর/এসআর