কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনটি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতির মাঠে থাকলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতে বিএনপি সাধারণত জামায়াতে ইসলামীর জন্য আসনটি ছেড়ে দিত। তবে দীর্ঘদিনের জোট রাজনীতির সমীকরণ ভেঙে যাওয়ায় এবার বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় হারানো আসনটিতে প্রত্যাবর্তন করতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াত। আর বিএনপি চায় ভোটের জোয়ারে জয় পেতে।
ভোটার ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আসনটিতে বিএনপি যদি পরিবর্তন আনতে পারে, সেটি হবে কেবল তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার ফল। আর জামায়াতের যদি প্রত্যাবর্তন হয় তবে সেটি হবে বিএনপির অনৈক্যের কারণেই।
এবারের নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পি। তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আসাদুল্লাহ ফকির ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মণ্ডল।
স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসনটিতে বিএনপি সর্বশেষ জয় পেয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জয় পায় জামায়াত। অন্য নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। এবার বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
কয়রা উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা সুজা উদ্দিন বলেন, ‘খুলনা-৬ আসন জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে দুবার আমাদের প্রার্থী এমপি হয়েছেন। মানুষের যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে এবারো দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী জয়ী হবেন বলে আশা করছি।’
অবশ্য জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী স্থানীয় বিএনপির নেতারাও। কয়রা উপজেলা বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব এমএ হাসান বলেন, ‘এ এলাকায় বিএনপির নিজস্ব ভোটব্যাংক আছে। জোটবদ্ধ রাজনীতির কারণে আগে ছাড় দিতে হয়েছে। এবার নিজস্ব প্রার্থী থাকায় আমরা সুফল পাব। দীর্ঘদিন পর আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারব বলে আশা করছি।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এর মধ্যে নারী ২ লাখ ৮ হাজার ৫২৪, পুরুষ ২ লাখ ১০ হাজার ২০৯ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন একজন।
সরজমিনে নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। অবহেলিত এ উপকূলীয় জনপদে এবার নতুন কোনো পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন ভোটাররা।
পাইকগাছার বাসিন্দা স্নেহেন্দু বিকাশ বলেন, ‘এ আসনে হিন্দু ভোটার রয়েছেন ৯৪ হাজার ৬১৩ জন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোটারও রয়েছেন। সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোট যেদিকে বেশি যাবে, শেষ পর্যন্ত জয় তারই হবে। সামান্য ব্যবধানও ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’
এ আসনের ভোটারদের বড় অংশই সুন্দরবননির্ভর শ্রমজীবী মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে টিকে থাকতে হয় তাদের। তাদের কাছে নির্বাচনের মূল ইস্যু হয়ে উঠেছে উপকূলের উন্নয়ন। পাশাপাশি তারা চান নির্বাচনে নতুন সরকার এলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং সংখ্যালঘু ও নারীদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির সংকট নিরসন, চিকিৎসাসেবার উন্নতি ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন বিকাশ। যারা দীর্ঘদিনের এ বঞ্চনা দূর করে টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন, তাদেরই তারা বেছে নেবেন।
বিএনপি প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পি বলেন, ‘নির্বাচিত হলে নদীভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ঘরে ঘরে সুপেয় পানি সরবরাহ ও কয়রায় ২৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। কয়রা ও পাইকগাছায় বিচারিক আদালত স্থাপন এবং সব উন্নয়ন প্রকল্প স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।’
জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আগের জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি ও নিষ্ক্রিয়তায় সরকারি বাজেট লুটপাট হয়েছে। নির্বাচিত হলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বিদ্যালয়ের পর্যাপ্ত ভবন নির্মাণ ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতি দূর করা হবে।’
এসএমএস/এসআর