উৎপাদন খরচ ও পরিশ্রম কম হওয়ায় নীলফামারীর জলঢাকায় বেড়েছে কলা চাষ। বাজারগুলোতে কলার দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকরা হাটের দিনে বিভিন্ন রকম কলা আনছেন দূর দূরান্ত থেকে।
সরেজমিনে উপজেলার কৈমারী, মীরগঞ্জ, খুটামারা, কাঠালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মালভোগ, চিনি চম্পা, মেহের, সাগর, রঙ্গিনসহ বিভিন্ন উন্নতজাতের কলার চাষ হচ্ছে এলাকাগুলোতে।
কলাতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তেমন ভাবে না করে অল্প খরে ও শ্রমে অধিক মুনাফা অর্জন করা যায় বলে অনেকে ধান, পাট, আলু, ভুট্টা চাষ না করে এখন কলা চাষ করে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। তাই বিগত সময়ের চেয়ে এবারে উল্লেখযোগ্য হারে কলা চাষাবাদ করেছেন কৃষকরা।
কলা চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলা লাভজনক হওয়ায় তাদের মধ্যে কলা চাষে আগ্রহ বেড়েছে।
তবে কলা চাষে কিছু সমস্যা আছে বলেও জানিয়েছেন কৃষকরা। তাদের মতে, বাজারে মালভোগ ও চিনি চম্পা কলার দাম বেশি হলেও বাগানে রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দেয়। অন্যদিকে চিনি চম্পা কলা গাছে রোগের প্রার্দুভাব কম হয়। এ জন্য চিনি চম্পা কলা চাষ করছেন অনেকেই।
এক বিঘা জমিতে গত ১০ বছর থেকে কলা চাষ করে আসছেন খুটামারা ইউনিয়নের ক্যানেলের পার গ্রামের কৃষক হাবিব (৪০)। তিনি বলেন, 'আমার যে কলা বাগান বর্তমান রয়েছে, সেখানে এক সময় পটল, আলুসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ করতাম। সবজির আবাদ করার সময় জমিতে সব সময়ই কাজ করতে হতো এবং খরচও বেশি পড়তো। আর সবজির বিভিন্ন সময় কম-বেশি দাম পাওয়া যেত। পরে ওই জমিতে সবজির আবাদ ছেড়ে কলার চাষ শুরু করি। কলা চাষে খরচ ও পরিশ্রম কম লাভও বেশি।'
কলা চাষের পদ্ধতির বিষয়ে তিনি বলেন, 'জমি প্রস্তুত করে বিঘা প্রতি জমিতে ৩০০-৪০০টি চারা লাগানো যায়। বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখ মাসে জমিতে চারা লাগানোর দু-একদিন পর সেচ দিতে হয়। এর ৩০-৪০ দিন পর মুঁচি (চারা) গজানো শুরু হলে ইউরিয়া সার দেওয়া হয়। ৩০-৩৫ দিন পর ডিএপি (ড্যাপ), পটাশ, জিংক ও বোরন সার দেওয়া হয়। মাঝে মধ্যে কীটনাশকও দেওয়া হয়। গাছে কলা আসতে ৯ থেকে ১০ মাস সময় লাগে।'
তিনি আরও বলেন, 'কলা পরিপক্ক হতে আরও দুই মাসের মতো সময় লাগে। প্রথম বছর যেহেতু চারা থেকে গাছ হয় এ জন্য কলা আসা ও পরিপক্ক হতে সময় লাগে। দ্বিতীয় বছর আট মাসের মধ্যে কলা বাজারজাতকরণ সম্ভব হয়। প্রতি বছর বিঘা প্রতি ১ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা দামের কলা পাওয়া সম্ভব। আর প্রতি বিঘাতে খরচ পড়ে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। একবার চারা রোপণ করলে ৪-৫ বছর পর্যন্ত জমিতে থাকে। কলা বিক্রি করে বছর শেষে একবারে মোটা টাকা পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীরা বাগানে এসে কলা কিনে নিয়ে যান। আবার অনেক সময় নিজেরাই কলা হাটে নিয়ে বিক্রি করেন।'
১৭ শতক জমিতে কলা চাষ করে গত রমজানে ৫৫ হাজার টাকার কলা বিক্রি করেছেন কাঠালীর কলা চাষী সাইদুল (৫২)। তিনি গতবার কলা বিক্রি করেছেন ৪৫ হাজার টাকার। বর্তমানে তিনি চিনি চম্পা কলা চাষ করেছেন।
কলা ব্যবসায়ী আনিছুর রহমান (৪৮) বলেন, 'কলা চাষীদের সঙ্গে রীতিমত পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে গেছে। অনেক সময় কৃষকদের অগ্রিম টাকাও দিয়ে রাখি। কলা বিক্রি করে চাষীরা লাভবান হলেও আমরা ব্যাপারীরা সেভাবে লাভবান হতে পারছি না। শ্রমিকের মজুরি থেকে ট্রাক ভাড়া সব কিছুর দাম বেড়েছে।'
২০০৭ সাল থেকে কলা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কৈমারী ইউনিয়নের বিন্যাকুরী গ্রামের পাইকারি ব্যবসায়ী ফারুক (৪৫)। তিনি বলেন, 'আমার মতো ২৫-৩০ জন ব্যবসায়ী আছেন। কলার সময়ে প্রতি হাটে প্রায় ২০-২৫ ট্রাক কলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। প্রতি ট্রাকে প্রায় দুই লাখ টাকার কলা থাকে। সে হিসাবে প্রায় ৪০-৫০ লাখ টাকার কলা যায়। এছাড়া স্থানীয় কিছু খুচরা ব্যবসায়ী প্রায় পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকার কলা বেচাকেনা করেন।
তিনি আরও বলেন, 'আমি প্রতি হাটে প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো কলা বিভিন্ন স্থানে পাঠাই। এর সঙ্গে কিছু ভাড়া ও আনুষঙ্গিক টাকা যোগ হয়। সবকিছু বাদ দিয়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে।'
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, 'কলা বর্ষজীবী উদ্ভিদ। কলা চাষে খরচ কম, ঝুঁকি ও রোগবালাই কম থাকায় জলঢাকায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একবার কলা চারা রোপণ করলে তা কয়েক বছর পর্যন্ত জমিতে রাখা যায়। সেই সঙ্গে আবাদে পর্যাপ্ত লাভের কারণে উপজেলার চরাঞ্চলের জমিগুলোতে ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বিভিন্ন জাতের কলা চাষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছে।'
এইচএস/এমএ