ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
স্বাধীনতা থেকে আধুনিকতা: বিভিন্ন শাসনামলে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিবর্তন ও রাজনৈতিক প্রভাব
✎ তানিয়া খাতুন
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
X

পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক থাকে। এই সম্পর্ক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও এই ধরনের সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। ১৯৭১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন শাসনামলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং চুক্তি করেছে। এছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ইত্যাদি বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। তবে প্রথম দিকের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত ও সমালোচিত, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

১৯৭১ সালে, বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তারা পাকিস্তানকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক সহায়তা প্রদান করেছিল, বিশেষ করে স্নায়ু যুদ্ধের সময়। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে, যখন পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব বাংলায় ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে (অপারেশন সার্চলাইট), তখন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক আর্চার ব্লাড একের পর এক রিপোর্ট পাঠিয়ে এই নৃশংসতা সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেন। এই প্রতিবেদনগুলোকে বলা হয় "Blood Telegram", যা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো কূটনৈতিক প্রতিবাদ ছিল। তবে হোয়াইট হাউজ এই বার্তাগুলোকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানের পাশে থাকার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে, যখন ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে এগিয়ে যায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র "USS Enterprise" নামক সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পাঠায়। অনেকেই এটিকে ভারত ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এক ধরনের হুমকি হিসেবে দেখেন।

১৯৭১ সালের ১৩ ও ১৫ ডিসেম্বর, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের জন্য পোল্যান্ড একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) গণহত্যা, ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহার, এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবি করা হয়েছিল। এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো প্রদান করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে দেরি করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। পরবর্তী ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ শুরু হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে। যোগদানের এক সপ্তাহ পর, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন।

ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ কেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ:

বাংলাদেশ এমন একটি স্থানে অবস্থিত যা এটিকে একটি কৌশলগত ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। এই অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে “Indo-Pacific Strategy”-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় রাখতে, যেখানে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীন ২০১৩ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) চালু করে, যেখানে বাংলাদেশ অবকাঠামো প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। QUAD (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান) ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের বিস্তার রোধ করতে চায়। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালের Indo-Pacific Strategy Document-এ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, “Bangladesh plays a critical role in the Indo-Pacific.”

এই অঞ্চলে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যেমন অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম ইত্যাদি। এছাড়াও, দিন দিন বাংলাদেশের অর্থনীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পোশাক ক্রয় করে। এই সব কারণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বঙ্গবন্ধুর শাসনামল: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক (১৯৭২-১৯৭৫)

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং সেই সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন-এর সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কূটনৈতিক ভিত্তি স্থাপন হয়। বঙ্গবন্ধু জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বের শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে, কিন্তু শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি কখনো কখনো সোভিয়েত-মৈত্রীসম্পন্ন নীতি হিসেবে দেখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। যদিও এটি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার আগমনের আগে-পরে নানা বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়। কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক মন্তব্য করেন, যার মধ্যে “bottomless basket” (তলাবিহীন ঝুড়ি) মন্তব্যটি সবচেয়ে আলোচিত। বঙ্গবন্ধু সরকার এই সফর থেকে কোনো বড় রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারেননি।

যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তা এবং কিছু উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করলেও, তাদের সমর্থন ছিল সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সহায়তা বিলম্ব বা বন্ধ রাখে। কারণ হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশ ভারত-সমর্থিত ও সোভিয়েত-সমর্থিত নীতি অনুসরণ করছে এবং কিছু বাণিজ্যিক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। পরে, ফুড ফর পিস (Food for Peace/PL-480) প্রোগ্রামের আওতায় খাদ্যশস্য সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও কিছু কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে USAID এর মাধ্যমে প্রকল্প সহায়তা প্রদান করা হয়।

১৯৭৫ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধু একদলীয় “বাকশাল” ব্যবস্থা চালু করেন, যা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মডেলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পছন্দ করত না। তারা বাংলাদেশে রাজনৈতিক মুক্তবাজার, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং পশ্চিমা ঘরানার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা করত।

জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন দিশা (১৯৭৫-১৯৮১)

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের পরিস্থিতি যখন নাজুক ছিল, তখন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। জিয়াউর রহমান তার বৈদেশিক নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনেন, যেমন: সমাজতন্ত্রের বদলে মুক্ত বাজার অর্থনীতির পথে হাটা, সোভিয়েতের বদলে আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব।

যুক্তরাষ্ট্র এই সুযোগটি সঠিকভাবে গ্রহণ করে, কারণ বাংলাদেশকে পাশে পেলে দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েতের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে। জিয়াউর রহমানের সময়ে বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে ব্যাপক পরিমাণে সাহায্য পেতে শুরু করে। এর মধ্যে ছিল: খাদ্য সহায়তা (PL-480 প্রোগ্রামের আওতায় গম ও চাল), বাঁধ, সেতু ও হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ঋণ, কৃষি খাতে ৮৪ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা, আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে আমেরিকার সাহায্য, ১৯৭৯ সালের ভয়াবহ বন্যায় আমেরিকার ত্রাণ সহায়তা, এবং আমেরিকা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান আমেরিকা সফর করেন এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই নেতা আলোচনা করেন কিভাবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও উন্নত করা যায় এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট কর্তৃক হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত প্রথম বাংলাদেশী রাষ্ট্রপতি। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মুক্ত নির্বাচন ইত্যাদির জন্য জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক (১৯৮২-১৯৯০)

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এই সময়কাল বিশ্ব রাজনীতিতে শীতল যুদ্ধের উত্তাপ বহন করছিল, এবং যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতে আগ্রহী ছিল। এরশাদের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল একাধারে বাস্তববাদী, সহনশীল ও কৌশলনির্ভর।

এরশাদের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃশ্যত অব্যাহত ছিল। সামরিক সরকার হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের দূতাবাস চালু রাখে এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। তবে রাজনৈতিক বৈধতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে সম্পর্ক অনেক সময় টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র এরশাদ সরকারের সময় বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছিল। USAID-এর মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য সহায়তা অব্যাহত ছিল। সহায়তার খাতগুলো ছিল: কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন। USAID Annual Report (1985) অনুসারে, শুধুমাত্র ১৯৮৫ সালেই প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার উন্নয়ন সহায়তা দেওয়া হয়।

এরশাদের শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেফতার, সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ এবং মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে ১৯৮৭-৮৮ সালে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রের দমননীতির বিরোধিতা করে।

১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ২৫% মার্কিন বাজারে গিয়েছিল।

বাংলাদেশ জেনারালাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স (GSP)-এর আওতায় মার্কিন বাজারে কিছু সুবিধা পায়। যদিও সামরিক সহযোগিতা সীমিত ছিল, তবে এরশাদ আমলে কিছু সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ কর্মসূচি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য কিছু প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়, তবে এটি মূলত প্রতীকী পর্যায়ে ছিল।

এরশাদ আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাস্তববাদী ও কৌশলগত ভিত্তিতে গঠিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থে সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক সরকারের পাশে সক্রিয়ভাবে দাঁড়ায়, যা সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা ও নতুন দিগন্ত (১৯৯০-২০০৮): জনগণের ইচ্ছা ও সম্পর্কের বাঁকবদল

১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের ইতিহাস একটি বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল অধ্যায়ের সাক্ষী। এই সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সংস্কার, এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে।

১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনের সমর্থন জানায় এবং কেসটার সেন্টারের মাধ্যমে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে।

এরপর, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলগুলি বর্জনের মুখোমুখি হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলির চাপে জুন মাসে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা (২০০১-২০০৬)

২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সতর্ক নজর রাখে, বিশেষ করে ইসলামিক দলগুলির উত্থান নিয়ে। ২০০৬ সালের শেষদিকে রাজনৈতিক সহিংসতা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, যা ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্ম দেয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য সম্পর্ক

১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) মার্কিন বাজারে ব্যাপক সাড়া জাগায়। ২০০৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানির ৮০% তৈরি পোশাক ছিল। তবে শ্রমিক অধিকার ও কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন সমালোচনা বাড়তে থাকে। ২০০৭ সালে মার্কিন কংগ্রেস GSP সুবিধা স্থগিত করার পদক্ষেপ নেয়, যা বাংলাদেশকে শ্রম আইন সংস্কারে বাধ্য করে।

USAID-এর উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এই সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। স্বাস্থ্যখাতে মাতৃমৃত্যুর হার ২০০০ সালের মধ্যে ৪০% কমানো যায়। শিক্ষা খাতে ১৯৯৩ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করা হয়।

২০০৬ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে Trade and Investment Framework Agreement (TIFA) স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

শেখ হাসিনার শাসনকাল: পরিবর্তনের ১৬ বছর (২০০৯–২০২৪)

শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন — বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প (১ম মেয়াদ), এবং জো বাইডেন।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিল জটিল এবং নানা চ্যালেঞ্জে ভরপুর। এই সময়ে সম্পর্কের মধ্যে সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব দেখা গেলেও, গনতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনাও স্পষ্ট ছিল।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সরকার গঠন করে। ২০০৮ সালের এই নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্র অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের সময় পুলিশের অভিযানকে বাংলাদেশে অনেকেই গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের বার্ষিক "Country Report on Human Rights Practices – Bangladesh (2013)"-এ শাপলা চত্বরে ঘটনার উল্লেখ করেছে।

রিপোর্টে বলা হয়: “forces used excessive force during a demonstration on May 5, leading to numerous deaths, although the number of casualties was disputed.”

পরবর্তী ২০১৩ সালে বাংলাদেশ "Bangladesh-US Counter Terrorism Cooperation Initiative" নামক একটি চুক্তির অনুমোদন দেয়, যার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় এবং আইনি সহায়তা প্রদানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এ সময় FBI (Federal Bureau of Investigation) এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতা করে, এবং DHS (Department of Homeland Security) এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা জোরদার করে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানির বৃহৎ বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে Trade and Investment Cooperation Forum Agreement (TICFA) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি মূলত দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে উভয় দেশ বাণিজ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করে।

বাংলাদেশ এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের GSP (Generalized System of Preferences) সুবিধা পেত। এছাড়াও USAID এর মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে সহায়তা অব্যাহত ছিল। এসব খাতে যুক্তরাষ্ট্র ১৩.৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রদান করেছে।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু আন্তর্জাতিক ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে GSP সুবিধা দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং শ্রমিক নিরাপত্তা ও ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা নিয়ে সমালোচনা করে।

২০১৪ সালে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং নির্বাচনকে "কমপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল না" বলে মন্তব্য করে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে। মার্কিন কংগ্রেস ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট নিয়মিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে এবং রিপোর্ট প্রকাশ করে। বাংলাদেশ সরকার এসব চাপকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিক্রিয়া জানায়।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় ২০০ মিলিয়নের বেশি অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগকে প্রশংসা করে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। এ সময় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যার মধ্যে ৯০% পোশাক।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়, বিশেষ করে LNG খাতে। Chevron ছিল বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মার্কিন বিনিয়োগকারী। একই বছর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পঞ্চম "Partnership Dialogue" আয়োজন করে। এই সংলাপে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ACSA (Acquisition and Cross-Servicing Agreement) এবং GSOMIA (General Security of Military Information Agreement) চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু বাংলাদেশ তা গ্রহণ করে না।

২০১৯ সালে USAID এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পরিবেশ রক্ষায় ৪,২১৯ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেয়। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের জন্য ৪৫৯ মিলিয়ন ডলারের নতুন মানবিক সহায়তা প্রদান করে খাদ্য, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য।

২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হয়, যা বিশ্বব্যাপী সংকট সৃষ্টি করে। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার COVAX উদ্যোগে অর্থায়ন করে, ফলে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন পাওয়ার পথ তৈরি হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ৬০ লাখের বেশি ডোজ Moderna এবং Pfizer টিকা উপহার দেয়।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের র্যাবের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্টের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে।

২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের গাড়ি অবরোধের ঘটনায় (মায়ের কান্না নামক একটি সংগঠন আন্দোলন করছিল; তারা রাষ্ট্রদূতকে কিছু বলতে চাচ্ছিল) যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগ তোলে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালের মে মাসে নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্তকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। ফলে বাংলাদেশের সরকারের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায়, ভোটের উপস্থিতি কম থাকায় (৪১.৮%) এবং সহিংসতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনকে অগণতান্ত্রিক ঘোষণা করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ হয় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউনুস দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে ইউনুস সরকারের সাথে আলোচনা করে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়। একই বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ইউনুস সরকারের মধ্যে বৈঠক হয়, যেখানে বাইডেন ইউনুস সরকারকে পূর্ণ সমর্থন জানান।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে পারে:

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করবে। এর মধ্যে কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে সহযোগিতা করছে। এছাড়াও, চীন যে পণ্য উৎপাদন করে, তা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় সারাবিশ্বে রপ্তানি করে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব হ্রাস করতে চায়, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য উৎপাদনের জন্য জ্বালানি শক্তির প্রয়োজন হয়, যা চীন ইরান থেকে আমদানি করে। ইরান থেকে এই জ্বালানি চীনে পৌঁছায় আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের পথ দিয়ে। তাই যুক্তরাষ্ট্র চীনকে টেক্কা দিতে বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

একই সময়ে, বাংলাদেশের অর্থনীতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণে পোশাক রপ্তানি করে। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, কারণ বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের উপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এই সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা, তহবিল এবং কৌশলগত সহায়তার মাধ্যমে দুই দেশের অংশীদারিত্ব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, এবং বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তার প্রভাব নিয়ে ঢাকায় নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকের মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বিশেষ করে পোশাক শিল্পে পড়তে পারে। অর্থাৎ সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাধীনতার পূর্ব থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে এগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন দিলেও, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রধান রপ্তানির গন্তব্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে।

সার্বিকভাবে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিবর্তনশীল পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে গঠিত। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝