ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে মাঠে সেনাবাহিনী
✎ আহসান হাবিব
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম
ফাইল ছবি
X

ফাইল ছবি

দরজায় কড়া নাড়ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর মাত্র সপ্তাহখানেক পরই আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ব্যালটের মাধ্যমে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার শুভ দিন। যেখানে দীর্ঘ বিরতির পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ লাভ করবেন ভোটাররা। ভোটারদের সে অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করতে নিরলস পরিশ্রম করছে সশস্ত্র বাহিনী।

গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নির্বাচন কখনোই নিছক একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ইতিহাসঘন, সংঘাতপ্রবণ এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনকেন্দ্রিক অবিশ্বাসে জর্জরিত একটি দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন মানে শুধু ভোটকেন্দ্রে ব্যালটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়- এটি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে সেই দায়িত্ব পালনের দৃশ্য এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে মাঠপর্যায়ে সশস্ত্র বাহিনীর সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো- সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কেবল দপ্তরকেন্দ্রিক নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ নেই। তিনি নিজেই দেশজুড়ে মাঠে নেমে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। গাজীপুর থেকে রংপুর, রাজশাহী থেকে পটুয়াখালী, খুলনা থেকে সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা- দেশের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে তাঁর সরেজমিন উপস্থিতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: এই নির্বাচনকে ঘিরে কোনো গাফিলতি, কোনো পক্ষপাত কিংবা কোনো অদক্ষতার সুযোগ নেই।

এই উদ্যোগে সেনাবাহিনী একা নয়। নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন- তিন বাহিনীর প্রধানের একযোগে মাঠে নামা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি কেবল প্রশাসনিক সক্রিয়তার চিত্র নয় বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোর পক্ষ থেকে গণতন্ত্র রক্ষার একটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার।

গাজীপুর সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা ছিল এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। সেখানে গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার অসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের সরাসরি আলোচনা নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। আলোচনায় কৌশলগত পরিকল্পনার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের মানসিকতা, আচরণ ও পেশাদারিত্বের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

তিন বাহিনীর প্রধানই স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশনা দিয়েছেন- নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। কোনো রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত মতাদর্শ যেন দায়িত্ব পালনে প্রভাব না ফেলে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নাগরিকবান্ধব, ধৈর্যশীল ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে- নিরাপত্তা ব্যবস্থার অতিরিক্ত কঠোরতা কখনো কখনো সাধারণ ভোটারের মনে ভীতি সৃষ্টি করেছে। সেই ভীতি দূর করেই ভোটকেন্দ্রমুখী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য।

‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’- এর আওতায় মোতায়েন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে সেনাপ্রধান ও অন্যান্য বাহিনী প্রধানরা কেবল প্রতিবেদন গ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকেননি বরং বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখেছেন। রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে মোতায়েন সেনা সদস্যদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, রংপুর সার্কিট হাউস ও রাজশাহীর বিআইআরসিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা স্পষ্ট করে দেয়- নির্বাচনী নিরাপত্তা প্রস্তুতি কোনো কাগুজে মহড়া নয় বরং মাঠের বাস্তবতা যাচাই করেই এগোচ্ছে।

পটুয়াখালী ও খুলনায় সেনাপ্রধানের উপস্থিতিও ছিল একই বার্তার দৃঢ় পুনরাবৃত্তি- পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যই হবে দায়িত্ব পালনের মূল ভিত্তি। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সামরিক-বেসামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা এবং পরে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মোতায়েন সেনা সদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন প্রমাণ করে কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত একটি একক কমান্ড ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর করা হচ্ছে।

সিলেট সফরেও একই চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সেনাপ্রধান আবারও জোর দিয়েছেন- নির্বাচন হতে হবে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু। ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় মোতায়েন সেনা সদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেছেন, নির্দেশনা যেন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং বাস্তব প্রয়োগেই তার সার্থকতা প্রমাণিত হয়।

এই ধারাবাহিক সফর ও নির্দেশনার মধ্যে একটি বিষয় বিশেষ ভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে- সামুদ্রিক প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলরেখা, দ্বীপাঞ্চল, নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকায় নির্বাচন পরিচালনা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখানেই নৌবাহিনীর ভূমিকা অনিবার্য। নৌবাহিনী প্রধানের মাঠে নামা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ এই বাস্তবতাকেই স্বীকার করে নেওয়ার প্রতিফলন। উপকূলীয় অঞ্চলে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পরিবহন ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা ছাড়া অবাধ নির্বাচন কল্পনাও করা যায় না। একই ভাবে বিমান বাহিনীর অংশগ্রহণ জরুরি দ্রুত যোগাযোগ, পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সাড়া নিশ্চিত করার জন্য।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষতা, বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং ভোটারদের মধ্যে ভয়মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর এই সক্রিয়, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা সেই মানদণ্ড পূরণের পথে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে। এটি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং সংবিধান, রাষ্ট্র ও জনগণের পক্ষে দৃঢ় ভাবে দাঁড়ানোর প্রকাশ।

সমালোচকেরা প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন- নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি কি গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি নয়? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আচরণে ও উদ্দেশ্যে। যখন বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেরাই মাঠে নেমে নিরপেক্ষতা, নাগরিকবান্ধব আচরণ ও পেশাদারিত্বের ওপর জোর দেন, তখন সেই উপস্থিতি আর ভয়ের প্রতীক থাকে না; বরং তা আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে। ভোটার জানে- তার ভোটাধিকার রক্ষায় কেউ আছে, যেকোনো অনিয়ম বা সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় ভাবে দাঁড়াবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট তাই শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলার দিক নির্দেশ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। যদি এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ দেখতে পায়- রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে, সমন্বিত ভাবে ও নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করেছে- তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন। মাঠপর্যায়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অক্লান্ত তৎপরতা এবং নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। এটি রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনে যখন নেতৃত্ব সামনে থেকে উদাহরণ সৃষ্টি করে, তখন নিচের স্তরেও তার প্রতিফলন ঘটে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের মাঠে নামা সেই উদাহরণই তৈরি করছে। দায়িত্ব এখন সবার- এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

এমএ


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝