অতিপরিচিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া (জিকে) শামীম কখনোই যুবলীগ বা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি জিকে বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী। ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গুলশান-নিকেতনস্থ তার কার্যালয় থেকে এলিট ফোর্স র্যাব জিকে শামীমকে আটক করে। ওই সময় র্যাব কর্মকর্তারা দাবি করেন, ‘তিনি (জিকে শামীম) যুবলীগের নেতা।’ কিন্তু গ্রেপ্তারের পরদিনই, ২১ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী উত্তরা-আজমপুরে যুবলীগের ওয়ার্ড সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ‘জি কে শামীম কোনো কালে, কোনো সময়ে, কোনো দিনই যুবলীগের কেউ ছিল না।’ পরে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে যুবলীগ চেয়ারম্যান পরিষ্কার করে বলেন, ‘যুবলীগের কোনো পদে সে আছে? আমি যুবলীগের চেয়ারম্যান—আমি তো তাকে নেতা বানাইনি। যুবলীগের কমিটির কোথাও তো তার নাম নেই। তাহলে আপনারা কেন বলছেন জিকে শামীম যুবলীগের নেতা? আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, জিকে শামীম অথবা গোলাম কিবরিয়া শামীম নামে যুবলীগের কোনো নেতা নেই।’
এদিকে ওই সময় কিছু গণমাধ্যমে জিকে শামীমকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই বিভিন্ন টেলিভিশন ও পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার করে বলেন, ‘জিকে শামীম নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নন, তিনি আওয়ামী লীগের কেউ নন। সহসভাপতি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হচ্ছেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী।’
একই সময় আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতেই জি কে শামীম নেই।’ সে সময় তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলা বা মহানগর আওয়ামী লীগের তালিকায় জি কে শামীম নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই।’ তিনি জানান, ২০১৭ সালের ১০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির অনুমোদন হয় এবং ওই কমিটির একটি অনুলিপি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। সেখানে জি কে শামীম নামের কোনো ব্যক্তির নাম নেই। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।
আওয়ামী লীগের তৎকালীন উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া আরও বলেন, জি কে শামীমকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’। ওই সময়কার যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘জি কে শামীম এক সময় যুবদলের সহ-সম্পাদক ছিল।’ তবে জিকে শামীমের ঘনিষ্ঠদের দাবি, এই বক্তব্যও সঠিক নয়।
প্রখ্যাত সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর ভয়েস বাংলায় এক সাংবাদিক বিশ্লেষণে বলেন, ‘২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের বলয়ের বাইরে থাকা ঠিকাদারদের শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ ধরনের সাজানো অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল জিকে শামীমের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি ব্যবসা দখল করে নেওয়া। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে জিকে শামীম বিনা বিচারে আটক ছিলেন।’
জিকে শামীম ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নাসির উদ্দিন পিন্টু ও হাবিব উন নবী সোহেল কমিটির সময়ে তিনি বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে ঠিকাদারি ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর ১৯৯১ সাল থেকে তিনি ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিশেষ শ্রেণির ঠিকাদার। ২০০৯ সালে গ্রেপ্তারের সময় র্যাব হেডকোয়ার্টার্স ভবন, বাংলাদেশ সচিবালয়ের ২০ তলা ভবন, ঢাকার হেয়ার রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভবনসহ প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার কাজ জিকে বিল্ডার্সের অধীনে চলমান ছিল। তিনি একটি ভয়ানক স্বার্থান্বেষী মহলের গভীর চক্রান্তের শিকার হন। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ওই মহল প্রশাসনের কাছে ভুল তথ্য দিয়ে জিকে শামীমকে গ্রেপ্তার করায়। গ্রেপ্তারের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা সুবিধাভোগী কিছু ঠিকাদার জিকে শামীমের ব্যবসাগুলো নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেন। এতে জিকে শামীম আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিকে শামীম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। এরপর আর সক্রিয় রাজনীতিতে জড়াইনি। আমি আমার ঠিকাদারি কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহলের রোষানলে পড়ে আমার জীবন থেকে ছয়টি বছর হারিয়ে গেছে। আমি বিনা দোষে ছয় বছর কারাবরণ করেছি। আমার সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। একটি কুচক্রী মহল এখনও আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্যসম্বলিত ফটোকার্ড ও পোস্ট প্রচার করে আমাকে হেয় করার চেষ্টা চলছে। আমি এসবের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
আরএন