সাভার থানা থেকে মাত্র ২০০ গজের মধ্যে অবস্থিত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যাক্ত ভবন থেকে আবারও দুই জনের আগুনে পুড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে গত ৩ মাসে একই স্থান থেকে ৫টি মরদেহ উদ্ধার করায় পরিত্যাক্ত এই ভবনটি সিরিয়াল কিলিংয়ের হটস্পটে পরিনত হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
রবিবার দুপুরে সাভার থানা রোডের সাভার সরকারী কলেজের সামনে অবস্থিত পরিত্যাক্ত পৌর ভবনের দোতলায় থাকা টয়লেটের ভিতর থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যার পর মরদেহগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ায় প্রাথমিকভাবে উদ্ধারকৃত মরদেহ দুটির পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে নিহতের মধ্যে এক নারী ও এক তরুনী রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদের মধ্যে নিহত তরুনীর নাম সোনিয়া বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। সে ভবগুরে হিসেবে এই এলাকায় ঘুরে বেড়াতো।
এদিকে ঘটনার পর পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে সম্রাট নামে এক যুবককে গ্রেপ্তর করেছে। প্রাথমিকভাবে এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সম্রাট জড়িত রয়েছে বলে জানিয়েছে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাভার কলেজের এক শিক্ষার্থী প্রসাবের জন্য কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি ভেতরে পোড়া মরদেহ দেখতে পেয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেন। পরে সাভার মডেল থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। এরপর লাশ সনাক্তের জন্য পুলিশ ব্যুারো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর সদস্য, র্যাব সদস্য ও পুলিশের পাশাপাশি সিআইডি দলের দস্যরা ঘটনাস্থলে পৌছে আলামত সংগ্রহ করেন।
স্থানীয়রা জানান, সাভার সরকারী কলেজ, সাভার প্রেসক্লাব এবং সেনা ক্যাম্পের মুখোমুখে স্থানে অবস্থিত পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যাক্ত ভবনে গত ৩ মাসে ৫ লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আমরাও আতঙ্কে আছি। ধারাবাহিকভাবে একের পর এক এমন হত্যাকান্ডের ঘটনায় এটি যেন হত্যাকান্ডের কেন্দ্রস্থলে পরিনত হয়েছে। এসব ঘটনায় কার্যকর প্রাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবং আগের হত্যাকান্ডগুলো রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় এলাকাবাসীদের মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভ বিরাজ করছে।
লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসা স্থানীয় এক নারী বলেন, সেনা ক্যাম্পের সামনে এভাবে একটি পরিত্যাক্ত ভবনে একের পর এক লাশ পাওয়ায় এখন আমরা ভয়ে আছি। ভবনটির এমন অবস্থা যে সেখানে উঠলেও ভয় লাগে, বুক ধরফর করে। এই অবস্থায় হয় ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা হোক না হয় এখানে পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হোক।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যা নামলেই ভবনটি মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে জেলা পরিষদ ও পৌরসভার মালিকানা জটিলতার ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কিছুদিন আগে নিরাপত্তার জন্য ভবনের আশপাশে কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা ও এলইডি লাইট স্থাপন করা হলেও কয়েকদিন ধরে সেই লাইটগুলো জ্বলছে না।
সাভার কলেজের ঠিক সামনে এমন একটি মৃত্যুকূপ থাকায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। দিনের আলোতেও ভবনটির পাশ দিয়ে হাঁটতে ভয় লাগে বলে জানায় তারা। একের পর এক খুনের ঘটনায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের কলেজে পাঠানো নিয়েই দ্বিধায় পড়েছেন।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী বলেন, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে সম্রাট নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক সম্রাট হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। এঘটনায় সাভার মডেল থানায় মামলা দায়েরের পাশাপাশি হত্যাকান্ডের সাথে আরও যারা জড়িত রয়েছে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও আগে ঘটে যাওয়া হত্যার ঘটনায় সম্রাটের সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
প্রসঙ্গতঃ গত ২৯ আগস্ট ভবনের ভেতর থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ চার মাস পেরিয়ে গেলেও তার পরিচয় শনাক্ত কিংবা হত্যার রহস্য উদঘাটন করা যায়নি। এরপর ১২ অক্টোবর একই ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে এক নারীর জবাই করা অর্ধনগ্ন মরদেহ উদ্ধার হয়। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে তদন্ত চললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। গত ২০ ডিসেম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলার টয়লেট থেকে উদ্ধার হয় আগুনে পোড়া ও অর্ধগলিত এক যুবকের মরদেহ। সর্বশেষ রবিবার দুপুরে দুই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হলো।
ওএফ/এসআর